স্নিগ্ধা চৌধুরী
নবরাত্রির মহিমা একান্তই অনন্য। প্রতিটি রূপে মা দুর্গার উপস্থিতি আমাদের জীবনকে দিশা দেখায়। বিশেষ করে মহাসপ্তমী, যেদিন মা দুর্গা তাঁর সপ্তম রূপ মা কালরাত্রি রূপে ধরা দেন। পৌরাণিক কথায় বর্ণিত আছে, শুম্ভ-নিশুম্ভকে দমন করার জন্য দেবীকে কালরাত্রির রূপ ধারণ করতে হয়েছিল। সেই মুহূর্তে দেবীর রূপ অন্ধকারময়, যেন ঘন কালো রাত, যার মধ্যে বিস্ময়কর শক্তি ছড়িয়ে পড়ে।
মা কালরাত্রির ত্রিনয়ন চিরন্তন মহাবিশ্বের মতো বিশাল ও দীপ্তিময়। তার তীক্ষ্ণ চোখে শত্রুর সর্বশেষ ভয় ও ধ্বংসের প্রতিফলন দেখা যায়। তার অগ্নিশিখার মতো চুল, চারিদিকে ছড়িয়ে থাকা শক্তির ঝাঁকুনি এবং শ্বাস থেকে বের হওয়া জ্বালাময়ী আগুন, সমস্ত অসৎ শক্তিকে শূন্যে মিলিয়ে দেয়। চার হাতের মধ্যে খড়গ, লোহার অস্ত্র, অভয় মুদ্রা এবং বরামুদ্রা প্রতিটি হাত একটি আলোকিত শক্তির প্রতীক। খড়গ দমনকারী শক্তি, লোহার অস্ত্র শত্রুর বিনাশ, অভয় মুদ্রা ভক্তকে নিরাপত্তা, বরামুদ্রা আশীর্বাদ ও সমৃদ্ধির প্রতীক।
পৌরাণিক কাহিনি অনুযায়ী, নবরাত্রির সপ্তম দিনে এই রূপে মা কালরাত্রিকে আরাধনা করলে সমস্ত শারীরিক ও মানসিক কষ্ট, ভূত-প্রেতের ভয়, অকাল মৃত্যু, রোগ, দুঃখ সব ধ্বংস হয়ে যায়। দেবীর এই অমোঘ শক্তি আমাদের জীবনকে আলোকিত ও সুস্থ রাখে। শাস্ত্রে বলা আছে, যিনি মা কালরাত্রিকে ভক্তি সহকারে পূজা করেন, তিনি অনন্ত শান্তি ও সুখ লাভ করেন।
সপ্তমীর তিথি অনুযায়ী ব্রহ্ম মুহূর্তে স্নান করে পূজা শুরু করতে হয়। পূজার সময় ঘিয়ের প্রদীপ জ্বালানো হয়, লাল ফুল, মিষ্টি, পাঁচ প্রকার ফল, গোটা চাল, ধূপ এবং গুড়ের সঙ্গে নৈবেদ্য নিবেদন করা হয়। বিশেষভাবে গুড়কে দেবীর পছন্দের জিনিস হিসাবে গ্রহণ করা হয়। পূজা শেষে দুর্গা চণ্ডী, দুর্গা সপ্তশতী বা কালরাত্রি মন্ত্র পাঠের মাধ্যমে পূজা সম্পন্ন হয়।
পৌরাণিক কাহিনিতে উল্লেখ আছে, শুম্ভ-নিশুম্ভের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় দেবী কালরাত্রি রূপে দেহে অন্ধকারের আভা, চোখে মহাবিশ্বের দীপ্তি এবং চুলে অগ্নি নিয়ে উপস্থিত হন। তার উপস্থিতিতে শত্রুর সমস্ত শক্তি নাশ হয়ে যায়। সেই কালরাত্রির তাণ্ডব, ভক্তদের কাছে আশীর্বাদ আর অসৎ শক্তির জন্য শাস্তি। এই দৈব শক্তিকে ধারণ করে জীবনের সমস্ত নারকীয় দুঃখ নাশ হয়।
মা কালরাত্রি শুধু ধ্বংসক নয়, তিনি শুভঙ্করীও। তার পূজা জীবনে সৌভাগ্য, শান্তি এবং অভ্যন্তরীণ শক্তি আনয়ন করে। তাই, প্রতিটি নবরাত্রি সপ্তমীতে ভক্তরা ঘিঞ্জি কল্পনার মধ্য দিয়ে দেবীর সামনে প্রণাম করেন। এই দিন, পূজার মন্ত্রমুগ্ধ পরিবেশ এবং দীপশিখার আলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় অন্ধকার যত গভীর হোক না কেন, মা কালরাত্রির শক্তি তা দূর করতে সক্ষম।
শাস্ত্র, পৌরাণিক কাহিনি এবং ভক্তদের বিশ্বাসের মিলনস্থলে মহাসপ্তমী দাঁড়ায়, যেখানে কালরাত্রির রূপ আমাদের জীবন সংগ্রামে অদম্য শক্তি এবং অশেষ আশীর্বাদ দেয়। এই দিনে মা কালরাত্রির পূজা শুধু ধর্মীয় নয়, এটি আত্মার মুক্তি এবং মানব জীবনের সমস্ত অশুভ শক্তি দূর করার এক মহাদিব্য শক্তির উৎসব।
