
মার্কিন বাণিজ্যনীতির প্রভাবে সৃষ্ট বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর বলেন, “শুল্কের অস্থিরতা আজ বিশ্বজুড়ে বাণিজ্যিক হিসাব-নিকাশকে ওলটপালট করে দিচ্ছে।”
জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক অধ্যয়ন বিভাগের ৭০তম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত প্রথম আরাবল্লী সম্মেলন-এ বক্তব্য রাখতে গিয়ে জয়শঙ্কর বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনের “কৌশলগত পরিণতি” নিয়ে বিশদ আলোচনা করেন।
তিনি বলেন, “আজ বিশ্ব উৎপাদনের এক-তৃতীয়াংশ একটি মাত্র ভৌগোলিক অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত, এর ফলে সরবরাহ শৃঙ্খল গভীরভাবে প্রভাবিত হচ্ছে। বহু দেশেই বিশ্বায়নের বিরোধিতা বাড়ছে। আর এই সময় বাণিজ্যিক হিসাবকে ওলটপালট করছে শুল্কের অস্থিরতা।”
বিদেশমন্ত্রীর এই মন্তব্য এসেছে এমন এক সময়ে, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারতীয় পণ্যের উপর শুল্ক দ্বিগুণ করে ৫০ শতাংশে উন্নীত করেছেন এবং রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানির কারণে অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন।
জয়শঙ্কর বলেন, “বিশ্ব জ্বালানি পরিস্থিতি ব্যাপকভাবে বদলে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র আজ জীবাশ্ম তেলের বড় রফতানিকারক, আর চিন নবীকরণযোগ্য শক্তির ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিচ্ছে। ডেটা ব্যবহারের ধরন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) বিকাশের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক মডেল একে অপরের সঙ্গে লড়ছে।”
তিনি আরও জানান, “বিগ টেক এখন একাই বৈশ্বিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। নতুন সংযোগের পথ তৈরি হচ্ছে, যেগুলির অনেকগুলিরই কৌশলগত উদ্দেশ্য রয়েছে। শ্রম, দক্ষতা ও সামাজিক প্রতিক্রিয়ার মধ্যে ভারসাম্য খোঁজার চেষ্টা চলছে।”
জয়শঙ্কর বলেন, নিষেধাজ্ঞা, সম্পত্তি বাজেয়াপ্তকরণ এবং ক্রিপ্টো মুদ্রার উত্থান— এই তিনটি বিষয় বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার চেহারা পাল্টে দিয়েছে।
“দুর্লভ খনিজ ও গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলির জন্য প্রতিযোগিতা তীব্র হয়েছে, প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ আরও কড়াকড়ি হয়েছে,” তিনি বলেন।
“অস্ত্রের মান এবং যুদ্ধের প্রকৃতি বদলে গেছে। এখন যুদ্ধ অনেক দূরপাল্লার, বেশি প্রভাবশালী এবং ঝুঁকিপূর্ণ,” মন্তব্য বিদেশমন্ত্রীর।
তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, “প্রযুক্তিগত অনুপ্রবেশ ও প্রভাবের মাধ্যমে জাতীয় সার্বভৌমত্ব ক্ষয় হচ্ছে। বৈশ্বিক নীতি ও নিয়মগুলোকে বারবার প্রশ্ন করা হচ্ছে, এমনকি অনেক ক্ষেত্রেই বর্জন করা হচ্ছে। এখন কেবল খরচ নয়, মালিকানা ও নিরাপত্তাও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রধান মাপকাঠি হয়ে উঠেছে।”
জয়শঙ্কর বলেন, “উৎপাদন কেন্দ্রীকরণ, সীমিত সরবরাহ শৃঙ্খল এবং নির্দিষ্ট বাজারের উপর নির্ভরতা, সবমিলিয়ে ‘end-to-end’ ঝুঁকি বাড়ছে। শক্তির ভারসাম্য এখন ক্ষমতার সীমারেখায় বদলে যাচ্ছে। বিশ্ব এখন সহযোগিতার পরিবর্তে প্রতিযোগিতার যুগে প্রবেশ করেছে।”
তিনি আরও যোগ করেন, “এখন সবকিছুই অস্ত্রায়িত হচ্ছে (weaponisation of everything), এবং দেশগুলো ক্রমশ বেশি আগ্রাসীভাবে নিজেদের স্বার্থে সেই অস্ত্র ব্যবহার করছে।”

ভারতের অবস্থান প্রসঙ্গে জয়শঙ্কর বলেন, “বিশ্বের অধিকাংশ দেশ নিজেদের রক্ষায় ব্যস্ত, কিন্তু ভারতের প্রয়োজন এই অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্যেও নিজের কৌশল নির্ধারণ করে এগিয়ে যাওয়া। আমাদের স্বার্থ রক্ষা করতে হবে, কিন্তু একসঙ্গে বৈশ্বিক শ্রেণিবিন্যাসেও উপরে উঠতে হবে।”
এক ছাত্রের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ভারতের বিদেশনীতি “একদিকে স্বাধীন, অন্যদিকে বাস্তববাদী।” তাঁর কথায়, “অতীতে যেমন ইন্দো-সোভিয়েত সম্পর্কের ক্ষেত্রেও আমরা জাতীয় স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দিয়েছিলাম, আজও তাই করছি। আন্তর্জাতিক নীতির দোহাই যারা দেয়, তাদের আমি জিজ্ঞেস করি, যখন সেই নীতি আমাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল, তখন তারা কোথায় ছিল? শেষ পর্যন্ত জাতীয় স্বার্থই সবার উপরে।”

