
স্নিগ্ধা চৌধুরী
দীপাবলির আলো জ্বলার আগেই রাজ্য রাজনীতিতে যেন আলোচনার চরকিবাজি ছেড়ে দিলেন শোভন চট্টোপাধ্যায়। এককালে কলকাতার ‘দিদির প্রিয়পাত্র’, পরে ‘ঘরছাড়া কানন’, আর এখন ফের তৃণমূলের রাজদরবারে প্রত্যাবর্তন! রাজনীতির চক্রব্যূহে এই প্রত্যাবর্তন যেন একেবারে সিনেমার মতো পটপরিবর্তন, সংলাপ, আবেগ সবই আছে।
নিউটাউন কলকাতা ডেভেলপমেন্ট অথরিটির (NKDA) চেয়ারম্যান পদে শোভন চট্টোপাধ্যায়ের নাম ঘোষণার পর থেকেই রাজনৈতিক মহলে সরগরম আলোচনা – এ নাকি কেবল পদ নয়, তৃণমূলের পুরনো সম্পর্কের পুনর্জন্ম। দার্জিলিঙের পাহাড়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে দুই ঘণ্টার গোপন বৈঠকের পরই এই নিয়োগ, যা যেন দীপাবলির প্রদীপের মতো আলো ফেলল রাজনৈতিক জল্পনার অন্ধকারে।
কখনও কলকাতার পুরসভার কর্তা, কখনও দলের মুখ, আবার একসময় বিজেপির পতাকাতলে ‘বিক্ষুব্ধ তৃণমূলী’। কিন্তু বিজেপির সঙ্গে পথ চলা শোভনের মন ভরায়নি দিদির আহ্বান, অভিষেকের সখ্য, আর রাজ্যের ‘রাজনীতির মায়া’ অবশেষে ফিরিয়ে আনল তাঁকে ঘাসফুলের ছায়াতলে।
শোভনের প্রতিক্রিয়া? ভদ্রলোকি কৃতজ্ঞতায় ভরা, আমার চোখের সামনে নিউটাউন শহর গড়ে উঠেছে। দিদি আজ আমাকে গুরুদায়িত্ব দিয়েছেন। আমি যথাসাধ্য করব। কিন্তু রাজনীতির পাঠকরা জানেন, এই বাক্যের ভেতরেও লুকিয়ে থাকে ‘রাজনৈতিক পুনর্জন্মের’ গোপন আনন্দ। একসময়ের পরিত্যক্ত প্রিয়জনের ফের ঘরে ফেরা, এটা তৃণমূলের জন্য আবেগেরও, কৌশলেরও মুহূর্ত।
বিরোধীরা অবশ্য ব্যঙ্গ করতে ভোলেননি। কেউ বলছেন, তৃণমূলের দরজা খুলল পুরনো ভিআইপি ক্লাবের সদস্যদের জন্য। কেউ আবার ঠোঁট বাঁকিয়ে মন্তব্য করেছেন, “দিদির রাজনীতি এখন একেবারে Netflix সিরিজের মতো যে চরিত্র এক সিজনে হারায়, সে-ই পরের সিজনে ফিরে আসে আরও জমকালোভাবে!
তবে বাস্তব বলছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখন বড় খেলায় মেতেছেন। ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনের আগে পুরনো সৈনিকদের ফেরানো তাঁর কৌশল। অভিষেকের তত্ত্বাবধানে তৃণমূল এখন ‘মমতা ২.০’ মোডে, আর সেখানে শোভনের মতো অভিজ্ঞ মুখ দলকে পুরনো ভারসাম্য ফিরিয়ে দিতে পারে।
রাজনৈতিক মহলের অনেকে মনে করছেন, শোভনের প্রত্যাবর্তন শুধু এক ব্যক্তির ঘরে ফেরা নয়, বরং দলের ভেতরে বার্তা, যে দলে একবার ছিলে, ফিরে আসার দরজাও খোলা। এই ‘ঘরওয়াপসি নীতি’ হয়তো তৃণমূলের নতুন চিত্রনাট্য, যেখানে ক্ষমতা, আবেগ, এবং প্রতিহিংসা তিনেই সমান গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র।
দীপাবলির আগে এই রাজনৈতিক ‘প্রদীপ জ্বালানো’ তাই নিছক সৌজন্য নয়, বরং ভবিষ্যতের ইঙ্গিত। রাজনীতি নামের এই মহারঙ্গমঞ্চে মমতা ও শোভনের যুগলবন্দি ফের একবার প্রমাণ করল বাংলার রাজনীতিতে কিছুই অসম্ভব নয়। একমাত্র স্থায়ী হল পরিবর্তন, আর তৃণমূল সেই পরিবর্তনেরই নাম। রাজনীতির এই রসায়নে ‘ঘরওয়াপসি’র আলোয় তৃণমূলের ঘর আরও উজ্জ্বল, আর বিজেপির ঘর পড়ে আছে এক কোণে, নিভে যাওয়া প্রদীপের মতো।
