
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের দুই দিনের ভারত সফরের দিকে তাকিয়ে গোটা বিশ্ব। দিল্লিতে প্রোটোকল ভেঙে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নিজে বিমানবন্দরে গিয়ে অভ্যর্থনা জানান রুশ প্রেসিডেন্ট কে। উষ্ণ আলিঙ্গন বিনিময়ের মধ্য দিয়ে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সফরে আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়।
এই সফর এমন সময়ে হচ্ছে, যখন রাশিয়ান তেলের আমদানি বন্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতের ওপর চাপ বাড়িয়েছে। পাশাপাশি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে নতুন করে আলোচনা চালাচ্ছে।
ভারত-রাশিয়া সম্পর্ক: কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
দুই দেশের সম্পর্ক ভারত স্বাধীন হবার পর থেকেই যথেষ্ট মজবুত। পুতিন ও মোদীর মধ্যেও রয়েছে ঘনিষ্ঠতা। বিশ্লেষকদের মতে, এ সফর উভয়ের প্রয়োজনীয়তার কারণেই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
কেন ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক রাশিয়ার জন্য অপরিহার্য?
•প্রথমত, ভারতের প্রায় দেড়শ কোটি মানুষের বিশাল বাজার।
•৮%–এর বেশি জিডিপি প্রবৃদ্ধি, বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল বড় অর্থনীতি।
•বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল ভোক্তা দেশ ভারত।
ইউক্রেন যুদ্ধের আগে ভারতের মোট তেল আমদানির মাত্র ২.৫% ছিল রাশিয়া থেকে। নিষেধাজ্ঞা পরবর্তী ছাড়ে সেই হার বেড়ে দাঁড়ায় ৩৫%-এ। এতে ভারত লাভবান হলেও ওয়াশিংটনের অসন্তোষ বাড়ে। এ বছর ট্রাম্প প্রশাসন ভারতীয় পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ২৫% শুল্ক আরোপ করে, অভিযোগ তোলে—ভারত রাশিয়া থেকে তেল কিনে মস্কোর যুদ্ধ তহবিলকে শক্তিশালী করছে।
রাশিয়ার অস্ত্র বিক্রির আরেকটি বড় বাজার ভারত। পুতিনের সফরের আগে ভারত রুশ ফাইটার জেট ও আধুনিক এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম কেনার আগ্রহ দেখিয়েছে। কর্মী সংকটে থাকা রাশিয়া ভারতের দক্ষ কর্মীদেরও গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে দেখছে।
ভূরাজনীতির হিসাব
রাশিয়া দেখাতে চায়—ইউক্রেন যুদ্ধকে ঘিরে পশ্চিমা দেশগুলোর চাপ সত্ত্বেও তারা বিচ্ছিন্ন নয়। তাই ভারতের সঙ্গে সখ্য প্রদর্শন তাদের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
চীন সফর, শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক, এবং সেখানেই মোদীর সঙ্গে দেখা—তিন দেশের নেতাদের হাসিমুখে আলাপচারিতা বিশ্বকে বার্তা দেয়, রাশিয়া এখনও বহু মেরুভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থার বড় খেলোয়াড়। চীনের সঙ্গে “নো লিমিটস পার্টনারশিপ”, ভারতের সঙ্গে “বিশেষ ও প্রাধিকারপ্রাপ্ত কৌশলগত অংশীদারত্ব”—দুই-ই সমান গুরুত্ব পায় মস্কোর কূটনীতিতে।
মোদীর জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ এ সফর?
মোদী সরকার বরাবরই “কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন”-এ বিশ্বাসী। ভারতের লক্ষ্য—মস্কো ও পশ্চিম—দু’দিকের সঙ্গেই সম্পর্ক বজায় রাখতে সক্ষম হওয়া। কিন্তু ট্রাম্প ক্ষমতায় ফেরার পর ভারত-আমেরিকা বাণিজ্য সম্পর্কে চোরাবালি তৈরি হয়েছে। শুল্ক জট কাটছে না। ফলে এ প্রেক্ষাপটে পুতিনের সফর মোদীর জন্য কৌশলগত পরীক্ষার মুহূর্ত।
ইউরোপীয় দেশগুলিও ভারতের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। জার্মানি, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূতরা ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে যৌথভাবে রাশিয়ার অবস্থানের সমালোচনা করেছেন। তাই মোদীকে সতর্কভাবে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে—রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা যেন পশ্চিমা সম্পর্ককে ক্ষুণ্ন না করে।
বাণিজ্য বৃদ্ধির লক্ষ্য
ভারত-রাশিয়া দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ২০২০ সালের ৮.১ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০২৫ সালের মার্চে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৮.৭২ বিলিয়ন ডলারে। তবে এর বড় অংশই রুশ তেল আমদানি। ফলে বাণিজ্য ভারসাম্য রাশিয়ার পক্ষেই বেশি। মোদীর লক্ষ্য—ভারতীয় পণ্যের জন্য রাশিয়ার বাজারে আরও জায়গা তৈরি করা।
প্রতিরক্ষা খাতে সহযোগিতা
স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তথ্য—ভারতের রাশিয়া থেকে প্রতিরক্ষা আমদানি ২০১০–১৫–তে ৭২% থেকে কমে ২০২০–২৪–এ দাঁড়িয়েছে ৩৬%-এ। তবে ভারতীয় সামরিক বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ বহু প্ল্যাটফর্ম এখনও রাশিয়ান প্রযুক্তিনির্ভর, যেমন—সুখোই-৩০ যুদ্ধবিমান, এস-৪০০ এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম।
পাকিস্তান-ভারত সীমান্তে সাম্প্রতিক সংঘর্ষে রুশ সরঞ্জামের কার্যকারিতা প্রমাণিত হয়েছে। ভারত নতুন এস-৫০০ সিস্টেম ও সু-৫৭ পঞ্চম প্রজন্মের জেট কেনার আগ্রহ দেখাচ্ছে।
রাশিয়ার বাজারে ভারতীয় পণ্য ঢোকানোর চেষ্টা
স্মার্টফোন, চিংড়ি, মাংস, পোশাক—ভারতীয় রপ্তানি রাশিয়ায় খুবই কম। যুদ্ধ শেষে রাশিয়া বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ফিরে গেলে ভারত সেখানে অবস্থান শক্ত করতে চায়।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সফর ঠান্ডা যুদ্ধের নস্টালজিয়া নয়; এটি ঝুঁকি, সরবরাহ শৃঙ্খল ও অর্থনৈতিক স্থিতি নিয়ে নতুন বাস্তবতার আলোচনা। মোদী চান—রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত হোক, কিন্তু পশ্চিমের সঙ্গে সম্পর্কও যাতে অটুট থাকে। পুতিনের এই সফর সেই সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখার এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

