
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির রসায়নে বাবরি মসজিদের নাম উচ্চারিত হলেই যে আলাদা উত্তাপ তৈরি হয়, তা কি শুধু ইতিহাসের কারণে, নাকি রাজনৈতিক লোভের আগুন এতে আরও ঘৃতাহুতি দেয়? হুমায়ূন কবীরের হঠাৎ করে ওঠা “বাবরি মসজিদ নির্মাণের প্রস্তুতি” ঘিরে প্রশ্ন ওঠে, এটা কি তাঁর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা, নাকি একটি বৃহত্তর সাংগঠনিক উদ্দেশ্যের অন্ধ প্রতিচ্ছবি? আর যদি সত্যিই কোনও বৃহত্তর ইঙ্গিত থাকে, তবে কেন মুখ্যমন্ত্রী এক মুহূর্ত দেরি না করে তাঁকে শাস্তির মুখে ঠেলে দিলেন?
যে নেত্রীকে বিজেপি দীর্ঘদিন ধরে মুসলিম তোষণের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছে, যিনি প্রকাশ্যে কোরান পাঠ করেন, নামাজের অনুষ্ঠানে অংশ নেন, সংখ্যালঘুদের রাজনৈতিক স্বাধীনতার পাশে নিজেকে নিবেদিত বলেন, তিনি হঠাৎ করে কেন বাবরি ইস্যুতে কঠোর অনমনীয়তার পথ বেছে নিলেন? তিনি কি উপলব্ধি করলেন যে অতীতের ক্ষতকে নতুন করে আঁচড় লাগাতে দিলে বাংলার সামাজিক পরিসর আরও বিপজ্জনক জটিলতায় জড়িয়ে পড়বে? নাকি তিনি বুঝলেন, বাবরি নামের প্রতীকের সঙ্গে রাজনীতি করতে গেলে রাজ্যবাসীর ধৈর্যের পরীক্ষা আরও কঠোর হবে, আর সেই পরীক্ষার দায় নিতে তাঁরা প্রস্তুত নন?
তৃণমূলের এই সিদ্ধান্ত কি নিছক দলের স্বচ্ছ ভাবমূর্তি রক্ষার প্রয়াস, নাকি এর মধ্যে লুকিয়ে আছে এক নির্ভুল রাজনৈতিক হিসেব, যেখানে সংখ্যালঘু সমর্থন বজায় রাখার পাশাপাশি সংখ্যাগুরুদের আশঙ্কাও প্রশমিত করার কৌশলগত প্রয়াস দেখা যায়? আর যদি তা-ই হয়, তবে বিজেপির বহুদিনের প্রচারের কী হবে, যেখানে তারা দাবি করেছে তৃণমূল নাকি সবসময় মুসলিম রাজনীতির দিকে হেলে থাকে? মুখ্যমন্ত্রীর এই ত্বরিত শাস্তিমূলক পদক্ষেপ কি সেই প্রচারকে মুহূর্তে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয় না?
বিজেপির পক্ষ থেকে কি এটাই আশা ছিল, যে একজন মুসলিম নেতার এমন মন্তব্য রাজনৈতিক আগুন জ্বালাবে, যার উষ্ণতায় তারা নিজেদের ভোটব্যাঙ্ক শক্ত করতে পারবে? যদি সত্যিই তাই হয়, তাহলে কেন এই আগুনের ফায়দা তারা তুলতে পারল না? কেন তৃণমূলের এক নির্দেশেই পুরো বিতর্কের ধারাবাহিকতা স্তব্ধ হয়ে গেল? এ কি বিজেপির রাজনৈতিক বিচক্ষণতার ঘাটতি, নাকি তৃণমূলের অদ্ভুত গতিশীলতা, যা মুহূর্তে প্রতিপক্ষের সম্ভাব্য অস্ত্র ভোঁতা করে দেয়।
হুমায়ূন কবীরের বক্তব্য কি সত্যিই কোনও ধর্মীয় আবেগের প্রতিফলন ছিল, নাকি তা ছিল এক ভুল রাজনৈতিক দৌড়, যাকে দ্রুত থামিয়ে মুখ্যমন্ত্রী একটি বার্তা দিতে চাইলেন, বাংলায় ধর্ম নিয়ে খেলা চলতে পারে, কিন্তু ধর্মের নামে অস্থিতিশীলতা মেনে নেওয়া হবে না? আর সেই বার্তা কি শুধুই দলের ভিতরের জন্য, নাকি বিরোধীদের সামনে এক রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ, যা বলে, জাত–ধর্মের নাম করে উত্তেজনার রাজনীতিতে বাংলার জমি এত সহজে দখলযোগ্য নয়।
এই পুরো ঘটনাপ্রবাহে তৃণমূল কি এক নিখুঁত রাজনৈতিক মাস্টারস্ট্রোক চালল, যেখানে হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের কাছে তারা নিজেদের ভারসাম্য প্রদর্শন করল? নাকি বিজেপির এই ঘটনায় কোনও কার্যকর প্রতিক্রিয়া না দেখাতে পারাই তাদের রাজনৈতিক দুর্বলতাকে প্রকাশ্যে এনে দিল? এই একমাত্র ঘটনায় কি প্রমাণ হয়ে গেল যে ধর্মীয় প্রতীক নিয়ে রাজনীতি করতে গেলে কেবল আবেগ নয়, প্রয়োজন কঠোর বুদ্ধিমত্তা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত যা কেউ নিল, আর কেউ নিতে পারল না?
প্রশ্ন থেকেই যায়, পশ্চিমবঙ্গে বাবরি মসজিদ কি সত্যিই তৃণমূলের কৌশলগত জয়, নাকি বিজেপির অনিবার্য পরাজয়ের আরেকটি নতুন দৃষ্টান্ত?
