
সভ্যতার দীর্ঘ বিবর্তনের পথ ধরে মানব সমাজে প্রতিটি প্রজন্মই বহন করে চলেছে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য, সংস্কৃতি এবং বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গী। ‘বেবি বুমার’ থেকে শুরু করে ‘মিলিনিয়ালস’ বা ‘Gen Y’ হয়ে আমরা এখন এসে পৌঁছেছি ‘জেনারেশন জি’ (Generation Z বা Gen Z)-এর যুগে। সাধারণত ১৯৯৭ সাল থেকে ২০১০ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া এই প্রজন্মটি হলো ডিজিটাল নেটিভস—যারা জন্ম থেকেই হাতের মুঠোয় পেয়েছে ইন্টারনেট, স্মার্টফোন এবং সোশ্যাল মিডিয়ার মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তি।
প্রযুক্তিনির্ভর জটিল জীবন এবং তার মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব
Gen Z-এর মনস্তত্ত্বের মূল চাবিকাঠি হলো তাদের এই ডিজিটাল জগৎ। তারা দ্রুত তথ্য গ্রহণ করে, বিশ্বজনীনভাবে সচেতন এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বিশ্বাসী।
১. দ্রুত তথ্য গ্রহণ ও অস্থিরতা (Rapid Information Intake and Impatience)
- মনস্তত্ত্ব: দ্রুতগতির ডিজিটাল পরিবেশ তাদের মধ্যে অস্থিরতা (Impatience) সৃষ্টি করেছে। তথ্যের সহজলভ্যতা তাদের মনোযোগের সময়কাল (Attention Span) কমিয়ে দিয়েছে।
- ২. সামাজিক সচেতনতা ও মনস্ত্বত্ব — বিশ্ব সমস্যায় সচেতনতা তাদের মধ্যে উদ্দেশ্যবোধ (Sense of Purpose) এবং আদর্শবাদ (Idealism) জাগিয়েছে। তারা তাদের নীতি-আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কর্মক্ষেত্র খোঁজে।
৩) আর্থিক বাস্তববাদ ও নমনীয়তা (Financial Pragmatism and Flexibility)
তারা কঠোর পরিশ্রমের চেয়ে ‘ওয়ার্ক-লাইফ ব্যালেন্স’ এবং মানসিক স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দেয়। গতানুগতিক কাজের বদলে তারা ফ্রিল্যান্সিং বা ‘গিগ ইকোনমি’-র মাধ্যমে নমনীয়তা চায়।
Gen Z এবং মানসিক স্বাস্থ্য সংকট: সমস্যা ও প্রভাব
Gen Z-এর মনস্তত্ত্বের সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং দিকটি হলো তাদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান মানসিক স্বাস্থ্য সংকট। অন্যান্য প্রজন্মের তুলনায় এই প্রজন্ম মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়ে অনেক বেশি খোলাখুলি কথা বললেও, উদ্বেগের বিষয় হলো এই সমস্যাগুলো তাদের জীবনকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করছে।
গুরুত্বপূর্ণ মানসিক সমস্যাসমূহ:
১. উদ্বেগ ও হতাশা (Anxiety and Depression): ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ মেন্টাল হেলথ (NIMH)-এর তথ্য অনুসারে, কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে উদ্বেগের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বৈশ্বিক মহামারী, সামাজিক অস্থিরতা এবং ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা এই সমস্যাগুলিকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
২. FOMO (Fear of Missing Out) ও তুলনা: সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলি, যেমন Instagram বা Snapchat, ক্রমাগত অন্যদের ‘নিখুঁত’ বা ‘উন্নত’ জীবনের চিত্র তুলে ধরে। এর ফলে Gen Z-এর মধ্যে FOMO তৈরি হয় এবং নিজেদের জীবনের সঙ্গে অন্যদের জীবনের তুলনা করে তারা অপমান ও হতাশা অনুভব করে।
৩. ডিজিটাল বার্ন আউট (Digital Burnout) ও একাকীত্ব: ২৪/৭ অনলাইন সংযোগের কারণে তাদের মস্তিষ্ক কখনও সম্পূর্ণ বিশ্রাম পায় না। এই ধ্রুবক চাপ তাদের মধ্যে ডিজিটাল ব্রেক আউট সৃষ্টি করে। Paradoxically, এত মানুষের সাথে যুক্ত থেকেও তারা গভীর একাকীত্ব (Loneliness) অনুভব করে, কারণ তাদের ভার্চুয়াল সংযোগগুলি প্রায়শই অর্থপূর্ণ সামাজিক সম্পর্ককে প্রতিস্থাপন করতে পারে না।
৪. সাইবার-বুলিং (Cyber-Bullying): অনলাইনে হয়রানির ভয়, সমালোচনা এবং আক্রমণ তাদের আত্মসম্মানে গুরুতর আঘাত হানে এবং দীর্ঘস্থায়ী মানসিক ট্রমা সৃষ্টি করে।
মানসিক সমস্যার প্রভাব: - শিক্ষাজীবনে প্রভাব:
উদ্বেগ ও হতাশা মনোযোগের ঘাটতি ঘটায়, যা তাদের পড়াশোনা এবং পরীক্ষায় খারাপ ফলাফলের দিকে নিয়ে যেতে পারে। - কর্মক্ষেত্রে প্রভাব:
তারা এমন কর্মক্ষেত্র খোঁজে যেখানে মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব দেওয়া হয়। যদি কর্মক্ষেত্র অনুকূল না হয়, তবে তাদের মধ্যে ঘন ঘন চাকরি পরিবর্তনের প্রবণতা দেখা যায়। এই মানসিক চাপ তাদের উৎপাদনশীলতা (Productivity) কমিয়ে দেয়। - সামাজিক সম্পর্কে প্রভাব: মানসিক চাপ বা একাকীত্ব তাদের গভীর, বিশ্বাসযোগ্য সম্পর্ক স্থাপন করতে বাধা দেয়। তারা মুখোমুখি (In-person) সম্পর্ক এড়িয়ে চলতে শুরু করে।
- শারীরিক স্বাস্থ্য: মানসিক চাপ প্রায়শই ঘুমের ব্যাঘাত, দুর্বল খাদ্যাভ্যাস এবং শারীরিক স্বাস্থ্য সমস্যাকে আমন্ত্রণ জানায়।
উপসংহার
Gen Z হলো এক জটিল, প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত এবং সামাজিক-রাজনৈতিকভাবে সচেতন প্রজন্ম। তারা একাধারে সাহসী, স্বাধীনচেতা এবং বহুসংস্কৃতির প্রতি সহনশীল (Inclusive), আবার একই সাথে অস্থির, চাপগ্রস্ত এবং একাকীত্বের শিকার। তাদের মানসিকতা এই ডিজিটাল বিশ্ব দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত।
এই প্রজন্ম শুধু প্রযুক্তির ব্যবহারকারী নয়, তারা প্রযুক্তির একটি অংশ। Gen Z আমাদের শিখিয়েছে যে, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলা দুর্বলতা নয়, বরং এক নতুন ধরনের শক্তি। তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের এই সংকট মোকাবিলা করার জন্য সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং কর্মক্ষেত্রকে অবশ্যই আরও বেশি সহায়ক এবং সংবেদনশীল পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
ভবিষ্যতে বিশ্ব কেমন হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করছে এই প্রজন্মের ভাবনা, মূল্যবোধ এবং মানসিক সুস্থতার ওপর।
