
“যদা যদা হি ধর্মস্য…” যে মন্ত্রের প্রতিধ্বনি যুগে যুগে মানুষকে আলো দেখিয়েছে, সেই চিরন্তন বাণী আজ আবার যেন নবধ্বনিতে ভরিয়ে দিল কলকাতার আকাশ। ব্রিগেডের বিস্তীর্ণ প্রান্তরে আজ লক্ষ্য-র কণ্ঠে এই শ্লোক ধ্বনিত হওয়ার মুহূর্তে পরিবেশ যেন এক অলৌকিক শান্তিতে আবিষ্ট হয়ে উঠল। হাজারো মানুষের সমাগমও তখন নীরব, যেন প্রত্যেকেই অন্তরের গভীর থেকে অনুভব করছিলেন ধর্মের সত্য পথেই মানবজাতির মুক্তি।
সনাতন ধর্মের মর্মকথা কেবল আচারে নয়, আত্মার জাগরণে। গীতা তাই কোনো গ্রন্থমাত্র নয়, এ এক চিরন্তন দিশারী, যে মানুষের বিভ্রান্ত মনকে পথ দেখায়। আজকের অস্থির পৃথিবীতে যখন দুঃখ, অসহিষ্ণুতা আর ক্লান্তি মানুষকে গ্রাস করছে, তখন ব্রিগেডের গীতা-পাঠ ছিল যেন ধূসর দিনের ভেতর এক নির্মল প্রভাতের স্পর্শ।
লক্ষ্য-এর কণ্ঠে যখন শ্লোক উঠল
“গ্লানির্ভবতি ভারত…”
তখন মনে হচ্ছিল, এ উচ্চারণ যেন সমগ্র জাতির অন্তর থেকে উৎসারিত আবেদন মানবতার গ্লানি দূর হোক, অন্ধকার কেটে আলো ফিরুক। সনাতনী দর্শনে ধর্ম মানে কোনো সংকীর্ণতা নয়; ধর্ম মানে ন্যায়, সত্য, কল্যাণ এবং আত্মশুদ্ধি। আজকের এই পাঠ সেই বিস্তৃত, মানবমুখী ধর্মবোধকেই উজ্জ্বল করে তুলল।
ব্রিগেডের মাঠে আজ যেন পুরনো দিনের পবিত্র মন্ডপ ফিরে এল, যেখানে গীতার বাণী শুনে মানুষ নতুন শক্তি পেত। বোতলবন্দি জীবনের ভেতর যে সৌম্যতা, ধৈর্য আর গভীর চিন্তার অভাব দিন দিন প্রকট হচ্ছে, গীতা তার প্রতিষেধক। গীতা শেখায় বাহ্যিক ঝড় থামানো আমাদের কাজ নয়, কিন্তু অন্তরের ঝড় থামানোই প্রকৃত সাধনা। এই পাঠ যেন সেই কথাটাই আবার মনে করিয়ে দিল।
আরও এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা আজ ফুটে উঠল গীতা কোনো বিভাজনের গ্রন্থ নয়। এর বাণী সকলের, সর্বজনের। ধর্মের আলো যেমন সূর্যের আলো যার ওপর কোনো জাতি, গোষ্ঠী বা রাজনীতির দাবি চলে না। তাই আজকের এই পাঠ ছিল নিখাদ আধ্যাত্মিকতার উৎসব, যেখানে মানুষের অস্তিত্বের সার্থকতা খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা ছিল, কোনো দাবি বা বিরোধ নয়।
নতুন প্রজন্মের কণ্ঠে গীতার শ্লোক শুনে মনে হয়, আমাদের শিকড় এখনও জীবন্ত। এই শ্লোক শুধু বলা নয়, বহন করা এ এক উত্তরাধিকার, এক ধার্মিক দায়িত্ব। সংস্কৃতির ভাঙন-গড়নের মধ্যেও যে সনাতন শক্তি অটল, আজকের ব্রিগেড সেই শক্তিকেই আবার দৃশ্যমান করল।
দিনের শেষে মনে হয়, গীতা কোনো দূরের বাণী নয়। এটি আমাদের প্রতিদিনের জীবনের দর্পণ। কর্মের মাধ্যমে নিজেকে গড়ার পথ, অহঙ্কারকে ত্যাগ করে কর্তব্যে অবিচল থাকার আহ্বান। আজ ব্রিগেডের মাঠে সেই আহ্বান আবার প্রতিধ্বনিত হল।
ধর্ম যখন কেবল গ্রন্থে নয়, মানুষের অন্তরে জেগে ওঠে তখন সমাজ বদলায়। আজকের গীতা-পাঠ সেই জাগরণের প্রথম অনুরণন হয়ে রইল।
যেখানে ধর্মের দীপ্তি জ্বলে, সেখানেই মানবতার জয়। আজ ব্রিগেডে সেই আলোই স্পষ্টভাবে অনুভূত হল নির্মল, শান্ত, চিরন্তন।
