
আজকের আধুনিক সমাজ কেবল রাজপথের ইঁট-কাঠ পাথরের নয়, এটি এখন স্মার্টফোনের স্ক্রিনেও বিরাজমান। সামাজিক মাধ্যম এখন আমাদের ব্যক্তিগত ডায়েরি থেকে শুরু করে পৃথিবীর খবর জানার প্রধান উৎস। কিন্তু এই অবাধ তথ্যপ্রবাহের সুবিধা নিয়েই জন্ম নিয়েছে এক নতুন ও মারাত্মক ব্যাধি— ভুয়ো খবর ও অপপ্রচারের ভয়াবহতা (Fake News and Misinformation)। এটি নীরব ঘাতকের মতো আমাদের গণমত নির্মাণের ওপর এক অদৃশ্য দখলদারিত্ব কায়েম করেছে।
গুজব: বিভাজনের নতুন অস্ত্র ও বিশ্বব্যাপী উদ্বেগ —-
গুজব ও অপপ্রচার এখন আর নিছক ভুল তথ্যের আদান-প্রদান নয়, এটি সমাজকে প্রভাবিত করার এক শক্তিশালী অস্ত্র। এর প্রভাব এতটাই সুদূরপ্রসারী যে, বহু ক্ষেত্রেই এটি মুহূর্তের মধ্যে সমাজে বিভাজন সৃষ্টি করতে, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করতে বা হিংসাত্মক ঘটনা উস্কে দিতে সক্ষম।
একটি মিথ্যা তথ্য যখন ছবি, ভিডিও বা আবেগপ্রবণ ক্যাপশনের মোড়কে হাজার হাজার বার শেয়ার হয়, তখন তা দ্রুত বিশ্বাসযোগ্যতার মুখোশ পরে ফেলে।
মাইক্রোসফটের সাম্প্রতিক একটি রিপোর্ট এই উদ্বেগকে আরও গভীর করেছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, সারা পৃথিবীর ক্ষেত্রে যেখানে ৫০ শতাংশ মানুষ গুজবের শিকার, সেখানে ভারতের মতো একটি দেশের এই সংখ্যাটি ৫৪ শতাংশ। একইভাবে, ভুয়ো খবর ছড়ানোর ক্ষেত্রেও ভারত শীর্ষে। সারা পৃথিবীতে ৫৭ শতাংশ মানুষ ভুয়ো খবরের শিকার হলেও, ভারতে এর শিকার ৬৪ শতাংশ মানুষ। এই পরিসংখ্যানগুলি প্রমাণ করে, শুধু বিশ্ব নয়, ভারতবর্ষের কাছেও গুজব এবং ভুয়ো খবর এখন এক চরম উদ্বেগজনক বিষয়। ভারতে বেশ কিছু দিন ধরেই বিভিন্ন গোষ্ঠী নিজেদের মতাদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে ভুল খবর, ছবি এবং ভিডিও তৈরি করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দিচ্ছে এবং নির্বাচন এগিয়ে আসার সঙ্গে এই প্রবণতা আরও বাড়ছে।
পক্ষপাতদুষ্ট প্রচার এবং স্বার্থের খেলা
আধুনিক সমাজে এই মিথ্যার প্রভাব সুগভীর। আমরা দেখেছি কীভাবে একটি ভুয়ো খবর দ্রুত রাজনৈতিক মেরুকরণকে তীব্র করে তুলেছে, জনস্বাস্থ্যের বিষয়ে বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে, এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করেছে। মানুষ এখন যা সত্য, তা নয়; বরং যা তারা শুনতে চায়, সেটাই বিশ্বাস করে— আর এই দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছে অপপ্রচারকারীরা।
সামাজিক মাধ্যমের এই গুজব এবং মিথ্যা অপপ্রচার প্রায়শই পক্ষপাতদুষ্ট হয়। এর পিছনে কাজ করে একাধিক শক্তিশালী পক্ষ। কখনও তা হয় রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করার কৌশল— যেখানে বিরোধী পক্ষকে হেয় করা বা একটি নির্দিষ্ট মতাদর্শকে জোর করে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা চলে। আবার কখনও কখনও এর সঙ্গে যুক্ত হয় কিছু গণমাধ্যমের বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য ও নিজ স্বার্থ চরিতার্থ করার প্রবণতা, যারা কেবল ক্লিক বা ভিউ বাড়ানোর লোভে সত্যতা যাচাই না করেই বিতর্কিত বা বিভ্রান্তিকর খবর পরিবেশন করে। এই স্বার্থান্বেষী মহলগুলি অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে মিথ্যাকে সত্যের মোড়কে পরিবেশন করে, যা সাধারণ মানুষের বিচারবুদ্ধিকে অন্ধকারে ঠেলে দেয়।
আমাদের ভূমিকা: সচেতনতাই একমাত্র প্রতিরোধ
এই ভয়াবহ চক্র ভাঙতে প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ। এই সমস্যার মোকাবিলায় সরকার ও প্রশাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে— দ্রুততার সঙ্গে সত্যতা যাচাই করা, অপপ্রচারকারীদের চিহ্নিত করা এবং উপযুক্ত আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া।
কিন্তু এই লড়াইয়ে সবচেয়ে জরুরি ভূমিকাটি হলো সাধারণ মানুষের। আমাদের মনে রাখতে হবে —-
১. প্রশ্ন করুন: স্ক্রিনে ভেসে আসা প্রতিটি খবরকে বিনা প্রশ্নে বিশ্বাস করা বন্ধ করতে হবে। তথ্যের উৎস যাচাই করুন।
২. অনুভূতিকে নিয়ন্ত্রণ করুন: আবেগপ্রবণ খবর বা ছবি দ্রুত শেয়ার করার আগে দু’বার ভাবুন। আবেগই অপপ্রচারকারীদের প্রধান হাতিয়ার।
৩. ভেরিফিকেশন টুল ব্যবহার করুন: সত্যতা যাচাইয়ের জন্য সহজলভ্য টুলস বা স্বীকৃত ‘ফ্যাক্ট-চেকিং’ সংস্থাগুলির সাহায্য নিন।সামাজিক মাধ্যম একটি শক্তিশালী মঞ্চ, কিন্তু তাকে বিষাক্ত হতে দেওয়া যাবে না। এর বিরুদ্ধে সর্বতোভাবে সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ ও সচেতনতা বাঞ্ছনীয়। যদি আমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল হই এবং একটি ‘শেয়ার’ করার আগে এক মুহূর্তের জন্য থেমে যাই, তবেই এই অদৃশ্য দখলদারিত্বের জাল আমরা ছিন্ন করতে পারব এবং সুস্থ, সত্য-নির্ভর গণমত প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হব।
