
একসময় যে নারীকে শুধুমাত্র সংসারের অন্দরেই সীমাবদ্ধ রাখা হতো, আজ সেই নারীই দেশের অর্থনৈতিক মানচিত্রে এক নতুন স্বাক্ষর রাখছেন। চিরাচরিত ধ্যানধারণা ভেঙে গ্রামবাংলার মেয়েরা আজ শুধু ‘যে রাঁধে সে চুলও বাঁধে’ এই প্রবাদকেই সার্থক করছেন না, তাঁরা প্রমাণ করে দিচ্ছেন ‘আমরা নারী, আমরা সব পারি!’ তাঁরা এখন পরিবর্তনের নতুন শিকড়, যা থেকে জন্ম নিচ্ছে আত্মনির্ভরশীল সমাজ।
আত্মনির্ভরতার পথে নারীশক্তি
সাম্প্রতিক বছরগুলিতে গ্রামবাংলায় নীরব বিপ্লব ঘটিয়েছেন নারী উদ্যোক্তারা। কাঁথা স্টিচ, হস্তশিল্প, পাটের কাজ, ক্ষুদ্র কৃষিভিত্তিক শিল্প, এমনকি প্রযুক্তি নির্ভর উদ্যোগেও তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মতো। এই মহিলারা শুধু নিজের আর্থিক উন্নতি করছেন না, বরং স্থানীয়ভাবে আরও অনেক দরিদ্র মহিলাকে কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিচ্ছেন, তৈরি করছেন ছোট ছোট অর্থনৈতিক চক্র।
একদিকে যেমন মালদার রেশম বা বাঁকুড়ার ডোকরা শিল্পে মহিলাদের সূক্ষ্ম কাজ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করছে, তেমনি অন্যদিকে অনেক মহিলা উদ্যোক্তা ছোট খাবারের ব্যবসা বা হোম ডেলিভারি পরিসেবা দিয়েও স্বাবলম্বী হচ্ছেন। যেমন, একসময় গৃহবধূ থাকা সত্ত্বেও আজ অনেক বাংলার মহিলা, তাঁর স্থানীয় হস্তশিল্পের ব্যবসাকে একটি সুপরিচিত ব্র্যান্ডে পরিণত করেছেন। তাঁদের সাহস আর সংকল্প প্রমাণ করে, সঠিক সুযোগ পেলে গ্রামীণ মহিলারাও সমাজের মেরুদণ্ড হতে পারেন।
সরকারি সহায়তায় অগ্রগতির সুযোগ
নারী উদ্যোক্তাদের এই উত্থানে সরকারের ভূমিকাও অনস্বীকার্য। দেশ তথা রাজ্যের অর্থনৈতিক উন্নতি তখনই সম্ভব যখন নারী-পুরুষ নির্বিশেষে উভয়ই উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবেন। এই লক্ষ্যেই, কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকার বেশ কিছু প্রকল্প এনেছে। যেমন—
- প্রধানমন্ত্রী মুদ্রা যোজনা (Mudra Yojana): ক্ষুদ্র ঋণ প্রদানের মাধ্যমে মহিলাদের ছোট ব্যবসা শুরু করতে সাহায্য করে।
- স্বয়ংসিদ্ধা/স্বনির্ভর গোষ্ঠী (SHGs): এই গোষ্ঠীর মাধ্যমে মহিলারা একত্রিত হয়ে ক্ষুদ্র সঞ্চয় ও ঋণের মাধ্যমে নিজেদের উদ্যোগকে এগিয়ে নিয়ে যান।
- স্ট্যান্ড আপ ইন্ডিয়া (Stand Up India): তফসিলি জাতি, উপজাতি এবং মহিলাদের জন্য ব্যাংক ঋণ সহজলভ্য করে উদ্যোগপতি হতে সাহায্য করে।
এই সরকারি স্কিমগুলি সাহসী মহিলাদের জন্য এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। এখন আর পুঁজি বা প্রশিক্ষণের অভাব বড় বাধা নয়।
এখন আর পিছিয়ে থাকা নয়
গ্রামের মহিলারা আজ অনেক বেশি সাহসী, সচেতন এবং আত্মবিশ্বাসী। তাঁরা বুঝতে পেরেছেন, নিজেদের ভাগ্য নিজেরাই গড়তে হবে। তাঁদের এই উদ্যোগ যেন সমাজের প্রতিটি কোণায় ছড়িয়ে পড়ে। আমরা বিশ্বাস করি, যখন একজন নারী উদ্যোগ নেন, তখন তার পরিবার, তার সমাজ এবং সর্বোপরি তার রাজ্যের অর্থনীতি লাভবান হয়।
এই লেখাটি সেই সকল অদম্য নারীকে অনুপ্রাণিত করবে, যাঁরা এখনও দ্বিধায় ভুগছেন। এগিয়ে আসুন! আপনার হাতেই রয়েছে আপনার এবং আপনার রাজ্যের ভবিষ্যতের চাবিকাঠি। মনে রাখবেন, সাহসী পদক্ষেপই পরিবর্তনের সূচনা করে। প্রতিটি নারী উদ্যোক্তা শুধু একজন সফল ব্যবসায়ী নন, তিনি আরও দশজন মহিলার অনুপ্রেরণা।
