
প্রবাসী শ্রমিকেরা হলেন সেই সকল সাহসী মানুষ, যাঁরা উন্নত জীবনের স্বপ্ন ও নিজ পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে দেশের সীমানা অতিক্রম করে ভিন্ন ভূখণ্ডে পাড়ি জমান। মূলত কাজের সন্ধানে, আরও ভালো মজুরির আশায়, অথবা দেশীয় কর্মসংস্থানের অভাবের কারণে আজকের দিনে বহু মানুষ মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, আমেরিকা বা এশিয়ার অন্যান্য দেশে প্রবাসী শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে বাধ্য হন। তাঁদের এই যাত্রা কেবল ব্যক্তিগত নয়, বরং তা দেশের বৃহত্তর অর্থনীতির জন্য এক অপরিহার্য চালিকাশক্তি।
দেশের অর্থনীতিতে শ্রমিকদের ভূমিকা
এই শ্রমিকদের কঠোর পরিশ্রম এবং পাঠানো রেমিট্যান্স বা বৈদেশিক মুদ্রা দেশের অর্থনীতিতে এক অদৃশ্য অথচ সুদূরপ্রসারী ভূমিকা পালন করে। তাঁদের অবদানকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক থেকে দেখা যায়।
- সামাজিক উন্নয়ন ও দারিদ্র্য দূরীকরণ: রেমিট্যান্স সরাসরি গ্রাম বাংলার পরিবারগুলিতে পৌঁছায়, যা তাঁদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করে। খাদ্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় স্থানীয় অর্থনীতিতে গতি আসে এবং উল্লেখযোগ্যভাবে দারিদ্র্য দূরীকরণে সাহায্য করে।
- অর্থনৈতিক পরিকাঠামোর উন্নতি: শ্রমিকদের পাঠানো অর্থ গৃহনির্মাণ, ছোট ব্যবসায় বিনিয়োগ এবং জমি কেনার কাজে ব্যবহার হয়, যা গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে। এই অর্থ জাতীয় আয়ের একটি বড় অংশ, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করে।
- সার্বিক উন্নয়ন (দেশ, রাজ্য ও পরিবার): এই রেমিট্যান্স দেশের বাণিজ্যের ঘাটতি পূরণে সহায়তা করে, রাজ্যগুলির অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সাহায্য করে এবং সর্বোপরি, প্রতিটি পরিবারের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করে। তাঁরা আক্ষরিক অর্থেই দেশ তথা রাজ্যের সার্বিক উন্নয়নের স্তম্ভ।
তাঁদের জীবনকথা ও প্রতিকূলতা
দেশের অর্থনীতির এই ‘নায়কদের’ জীবন কিন্তু মোটেই মসৃণ নয়। তাঁদের জীবন কাটে এক চরম প্রতিকূলতার মধ্যে দিয়ে — - পরিবার বিচ্ছিন্নতা ও মানসিক চাপ: মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর পরিবার থেকে দূরে থাকা তাঁদের জীবনে এক গভীর শূন্যতা সৃষ্টি করে। এই পরিবার বিচ্ছিন্নতা জন্ম দেয় তীব্র মানসিক চাপ ও অবসাদের।
- ঝুঁকিপূর্ণ জীবন ও কঠোর পরিশ্রম: অপরিচিত পরিবেশে, প্রায়শই অস্বাস্থ্যকর বাসস্থানে, তাঁদের ঝুঁকিপূর্ণ নির্মাণ কাজ, কারখানার কাজ বা কৃষি কাজ করতে হয়। অতিরিক্ত উপার্জনের জন্য তাঁরা নিজের শরীরের তোয়াক্কা না করে কঠোর পরিশ্রম করেন, যার ফলে অল্প বয়সেই শারীরিক অবক্ষয় দেখা যায়।
তাঁরা কেন আজও অদৃশ্য নায়ক?
এই শ্রমিকেরা দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হলেও তাঁদের ‘অদৃশ্য নায়ক’ বলা হয়, কারণ তাঁদের অবদানকে প্রথাগতভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় না এবং তাঁরা সমাজের মূল স্রোতে উপেক্ষিত থাকেন। - স্বীকৃতির অভাব: যদিও রেমিট্যান্স জাতীয় আয়ের একটি বিশাল অংশ, এই শ্রমিকদের নাম বা মুখ সাধারণত বড় অর্থনৈতিক আলোচনা বা রাষ্ট্রীয় সম্মাননার ক্ষেত্রে আসে না। তাঁদের ত্যাগ নীরবে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করে, কিন্তু তার জন্য তাঁরা কোনো সামাজিক বা রাজনৈতিক মর্যাদা পান না।
- নীতি নির্ধারণে অনুপস্থিতি: প্রবাসে কর্মরতদের জীবনযাত্রা, ঝুঁকি এবং প্রয়োজনগুলি নিয়ে দেশের অভ্যন্তরে নীতি নির্ধারণের সময় যথেষ্ট আলোচনা বা গুরুত্ব দেওয়া হয় না। তাঁরা দেশের বাইরে থাকায় তাঁদের সমস্যাগুলি স্থানীয় রাজনীতির বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে না।
- সামাজিক বিচ্ছিন্নতা: কঠোর পরিশ্রম ও দীর্ঘ সময় বিদেশে থাকার কারণে দেশের সামাজিক কাঠামোর সঙ্গে তাঁদের যোগসূত্র দুর্বল হয়ে পড়ে। ছুটি নিয়ে দেশে ফিরলেও তাঁরা একপ্রকার ‘বহিরাগত’-এর মতো থাকেন, যার ফলে তাঁদের পরিশ্রমের গুরুত্ব কেবল অর্থের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, সম্মানের ক্ষেত্রে নয়।
তাঁদের প্রতি দেশের মানবিক ভূমিকা
এই অদৃশ্য নায়কদের প্রতি দেশের মানবিক ও নৈতিক কর্তব্য শুধুমাত্র অর্থনৈতিক সুবিধার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়, বরং তাঁদের সুরক্ষা ও সম্মান নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সরকারের কর্তব্য হওয়া উচিত। - ১. সুরক্ষা ও আইনি সহায়তা:
- বিদেশে কর্মরত অবস্থায় শ্রমিকদের জন্য বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা, বিশেষত কর্মস্থলে কোনো বিরোধ বা শোষণের ক্ষেত্রে।
- প্রত্যেক শ্রমিকের জন্য বাধ্যতামূলক ও পর্যাপ্ত স্বাস্থ্য এবং জীবন বিমা নিশ্চিত করা, যা বিদেশেও কার্যকর থাকবে।
- ২. পুনর্বাসন ও সামাজিক সংহতি:
- দীর্ঘদিন বিদেশে কাজ করার পর দেশে ফিরে আসা শ্রমিকদের জন্য পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপন করা।
- তাঁদের অর্জিত দক্ষতা (Skills) কাজে লাগানোর জন্য বিশেষ ঋণ ও বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করা এবং তাঁদের উদ্যোগকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
- পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ এবং মানসিক চাপ মোকাবিলার জন্য নিয়মিত কাউন্সেলিং ও পরামর্শ পরিষেবা প্রদান করা।
সম্মান ও স্বীকৃতি প্রদান: - জাতীয় স্তরে প্রবাসী শ্রমিকদের অবদানকে স্বীকৃতি দিতে বিশেষ সম্মাননা বা দিবস ঘোষণা করা।
- তাঁদের অধিকার ও প্রাপ্য মজুরি নিশ্চিত করতে নিয়োগকারী দেশগুলির সঙ্গে নিয়মিত এবং শক্তিশালী কূটনৈতিক আলোচনা চালানো।
এই মানবিক পদক্ষেপগুলিই নিশ্চিত করতে পারে যে যাঁরা দেশের অর্থনীতির জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করছেন, তাঁরা যেন দেশেও উপযুক্ত মর্যাদা ও নিরাপত্তা পান।
