
আজকের দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে, আমরা প্রায়শই অর্থনৈতিক উন্নতি আর প্রযুক্তির অভাবনীয় অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা করি। কিন্তু এই উন্নতির আড়ালে লুকিয়ে থাকা একটি গভীর সংকটকে প্রায়ই উপেক্ষা করা হয়—তা হলো যুবসমাজের মানসিক স্বাস্থ্য সংকট। এই সংকট এখন আর ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, এটি একটি জাতীয় উদ্বেগ।
মানসিক স্বাস্থ্য কী ও কেন তা জরুরি?
মানসিক স্বাস্থ্য বলতে শুধুমাত্র মানসিক রোগের অনুপস্থিতি বোঝায় না। এটি হলো এমন এক সুস্থ অবস্থা, যেখানে একজন ব্যক্তি তার ভেতরের সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে জীবনের স্বাভাবিক চাপ সামলাতে পারে, উৎপাদনশীল ও ফলপ্রসূ কাজ করতে পারে এবং তার সমাজকে কিছু ফিরিয়ে দিতে পারে। শরীর ভালো রাখার জন্য যেমন পুষ্টিকর খাবার প্রয়োজন, ঠিক তেমনি সুস্থ মানসিকতা হলো জীবনের চালিকাশক্তি ও সাফল্যের ভিত্তি। একটি সুস্থ মন ছাড়া, কর্মজীবন, ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা—কোনোটাই টেকসই হতে পারে না।
ইঁদুর দৌড় ও প্রযুক্তির প্রভাব
আজকের দিনে আমাদের মানসিক স্বাস্থ্য বিঘ্নিত হওয়ার প্রধান কারণ হলো দুটি— সর্বগ্রাসী প্রতিযোগিতা এবং প্রযুক্তির নিরন্তর চাপ। কর্মক্ষেত্রে বা শিক্ষাজীবনে টিকে থাকার ‘ইঁদুর দৌড়’ এখন এক নতুন মাত্রা পেয়েছে। ‘আরও চাই’, ‘আরও ভালো করতে হবে’—এই প্রতিযোগিতা প্রতিনিয়ত আমাদের মস্তিষ্কে স্ট্রেস হরমোন নিঃসরণ করে চলেছে।
এর সাথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির দ্বিমুখী প্রভাব। একদিকে প্রযুক্তি জীবনকে সহজ করলেও, অন্যদিকে সোশ্যাল মিডিয়ার কৃত্রিম ‘সুখী’ জীবনের প্রদর্শন আমাদের মধ্যে এক গভীর হীনমন্যতা ও ব্যর্থতার অনুভূতি তৈরি করছে। আমাদের ব্যক্তিগত জীবনের মূল্যবান সময়টুকুও এখন অফিসের ইমেল বা সোশ্যাল মিডিয়ার স্ক্রোলে চলে যাচ্ছে। আমরা যন্ত্রের মতো চলছি, জীবনের আসল রসদ নিংড়ে নিচ্ছি।
নিসঙ্গতার নীরব মহামারী
এই অতিরিক্ত চাপ আর ব্যস্ততার চূড়ান্ত পরিণতি হলো নিসঙ্গতা ও একাকিত্বের নীরব মহামারী। প্রযুক্তির কল্যাণে আমরা হয়তো হাজার হাজার ‘বন্ধুর’ সাথে যুক্ত, কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে আন্তরিক সংযোগের অভাব প্রকট। যুবসমাজ আজ ভার্চুয়াল জগতে হাজারো মানুষের ভিড়েও গভীরভাবে নিসঙ্গ। এই নিসঙ্গতা থেকেই ধীরে ধীরে জন্ম নিচ্ছে উদ্বেগ, হতাশা এবং আত্মহত্যার মতো ভয়াবহ প্রবণতা। আজকের দিনে, ‘আমরা কাছাকাছি থেকেও কত দূরে’—এই কথাটিই যেন সবচেয়ে বেশি সত্য।
মুক্তির পথ: ভূমিকা হোক আমাদের
এই নিদারুণ সংকট থেকে মুক্তি পেতে হলে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। মনে রাখতে হবে, জীবন কেবল প্রতিযোগিতা নয়, জীবন হলো যাপনের শিল্প।
- ভারসাম্য: কর্মজীবন ও ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যে একটি স্পষ্ট সীমারেখা টানতে হবে। প্রতিদিনের রুটিনে মানসিক শান্তির জন্য ‘ডিজিটাল ডিটক্স’ বা নিজের শখের জন্য কিছুটা সময় রাখা আবশ্যিক।
- আসল সংযোগ: ভার্চুয়াল সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে এসে বাস্তব জীবনে পরিবার, বন্ধু এবং সহকর্মীদের সাথে খোলামেলা আলোচনা ও সময় কাটানো জরুরি। মন খুলে কথা বলা অনেক মানসিক চাপ কমাতে পারে।
- সাহায্য চাওয়া: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মানসিক সমস্যাকে দুর্বলতা হিসেবে না দেখা। প্রয়োজন হলে পেশাদার মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিতে দ্বিধা করা উচিত নয়।
পরিশেষে একটা কথা যুবসমাজকে বুঝতে হবে, আপনার ভালো থাকাটাই সবচেয়ে বড় সফলতা। সরকার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও পরিবারের যৌথ উদ্যোগে মানসিক স্বাস্থ্যকে আলোচনার মূলস্রোতে আনতে হবে। কারণ, একটি সুস্থ ও সতেজ যুবসমাজই পারে একটি সুস্থ জাতির স্বপ্ন বুনতে। এখনই সেই সময় নিজেদের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে মনযোগী হওয়ার।
