
ভারতীয় রাজনীতিতে জোটের ধারণা নতুন না হলেও, আজকের বিরোধী রাজনীতিতে এর গতিশীলতা এক গভীর আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সাম্প্রতিককালে, ক্ষমতাসীন ‘এনডিএ’ (NDA)-এর বিপরীতে যে ‘ইন্ডিয়া’ (INDIA) জোট গঠিত হয়েছে, তা ফের একবার প্রশ্ন তুলেছে: বিরোধী রাজনীতিতে জোটের ভিত্তি কি শুধুই কৌশল, নাকি আদর্শের সংমিশ্রণ?
রাজনৈতিক কৌশলকে সংজ্ঞায়িত করা হয় নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের পদ্ধতি হিসেবে, যার মধ্যে জনমতকে প্রভাবিত করা, প্রাতিষ্ঠানিক কৌশল এবং জোটের গতিশীলতা অন্তর্ভুক্ত। জোট রাজনীতি এই কৌশলেরই একটি অপরিহার্য দিক। যখন দুই বা ততোধিক দল একটি সাধারণ লক্ষ্য—যেমন নির্বাচনে জয়লাভ বা সরকার গঠন—এর জন্য সাময়িকভাবে একত্রিত হয় এবং ক্ষমতা ভাগ করে নেয়, তখনই রাজনৈতিক জোট জন্ম নেয়।
আদর্শ বনাম কৌশল —-
জোটের চালিকা শক্তি বিরোধী জোটের ক্ষেত্রে, প্রাথমিকভাবে এর মূল চালিকা শক্তি হলো কৌশল। এই দলগুলোর সাধারণ উদ্দেশ্য থাকে ক্ষমতাসীন সরকারকে চ্যালেঞ্জ করা বা ক্ষমতা থেকে সরানো। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য, আদর্শিক পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও দলগুলো কৌশলগত ঐক্য গড়ে তোলে। যেমন, ‘ইন্ডিয়া’ জোটে এমন দলগুলিও সামিল, যাদের রাজ্যের রাজনীতিতে একে অপরের সঙ্গে মৌলিক আদর্শগত বিরোধ রয়েছে। এই ক্ষেত্রে, ক্ষমতার ভাগাভাগি এবং নির্বাচনী সাফল্যই হয়ে ওঠে প্রধান বিবেচ্য বিষয়।
তবে দীর্ঘস্থায়ী সাফল্যের জন্য শুধু কৌশল যথেষ্ট নয়। যদি জোট টিকে থাকতে চায়, তবে তাকে একটি ন্যূনতম আদর্শিক ভিত্তি এবং ঐক্যবদ্ধ এজেন্ডা তৈরি করতে হয়। যেখানে আদর্শিক টানাপোড়েন ও ক্ষমতার লোভের চেয়ে সাধারণ মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা বেশি প্রাধান্য পায়, সেখানেই জোট শক্তিশালী হয়। যদি জোটের মূল লক্ষ্য কেবলই ক্ষমতা দখল হয় এবং আদর্শের কোনো স্পষ্ট অবস্থান না থাকে, তবে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব বা ক্ষমতার লোভ যেকোনো মুহূর্তে এই কৌশলগত ঐক্যকে দুর্বল করে দিতে পারে।
জোটের ভবিষ্যৎ ও মানবকল্যাণ
বিরোধী রাজনীতিতে জোটের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে এই ভারসাম্য রক্ষার ওপর। যদি জোট শুধুমাত্র ‘একজনকে হারানোর’ লক্ষ্যে তৈরি হয়, তবে এটি ক্ষণস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। অন্যদিকে, যদি জোটের একটি স্পষ্ট, সম্মিলিত অর্থনৈতিক ও সামাজিক মানবকল্যাণমূলক এজেন্ডা থাকে—যেমন কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা বা কৃষি সংস্কার—তবে তা জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায় এবং জোট দীর্ঘমেয়াদী হয়।
রাজনৈতিক জোটের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত শুধু ক্ষমতা ভাগ করে নেওয়া নয়, বরং জনগণের জীবনযাত্রার উন্নতি ঘটানোর জন্য একটি সম্মিলিত নীতি বাস্তবায়ন করা। আদর্শের অনুপস্থিতি রাজনৈতিক কৌশলকে নৈতিকভাবে দুর্বল করে তোলে। একটি সফল জোট তাই এমন হওয়া উচিত, যেখানে কৌশল আদর্শের সেবক হিসেবে কাজ করবে, আর সেই আদর্শের কেন্দ্রে থাকবে জনসাধারণের কল্যাণ ও উন্নয়ন।
সঠিক অর্থে, বিরোধী জোটের ভবিষ্যৎ হলো কৌশল এবং আদর্শের এক জটিল কিন্তু অপরিহার্য মিশ্রণ। দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতার জন্য, দলগুলোর উচিত সাময়িক কৌশলকে ছাপিয়ে একটি দৃঢ় মানবকল্যাণমুখী আদর্শিক ভিত্তি তৈরি করা।
