
কলকাতার শীতল হাওয়ায় যেন প্রথম আলোটা মিশে আসে কুয়াশার কাঁথা মুড়ি দিয়ে। শহর ততটা জেগে ওঠেনি, চায়ের দোকানের ধোঁয়া আর পেভমেন্ট ধোয়া জলের গন্ধে ভোরটা কেবল নিজের মতো করে তৈরি হচ্ছে। এমন সময়েই দেখা মিলল এক অসম্ভব অথচ মন-খোলা দৃশ্য লাল জামা, সাদা দাড়ি, মাথায় টুপি একেবারে চিরচেনা পোশাক, কিন্তু হাজির হলেন ট্রামে চড়ে! স্লেজ নয়, হরিণ নয়, কলকাতার পুরোনো ট্রামই আজ সান্তার বাহন।
ট্রাম নম্বর ২৩৩–এর জানালা দিয়ে সান্তা যখন প্রথম হাত নাড়লেন, শহরের নিদ্রালু ছন্দ যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। স্কুলে যাওয়া বাচ্চারা দৌড়ে এল, অফিসগামী লোক একটু থমকে দাঁড়াল, আর রাস্তায় চা খেতে থাকা মানুষের চোখে যেন উৎসবের ঝিলিক ছুটে গেল। যেন পুরোনো ট্রামের নড়বড়ে কাঠ-লোহার গাড়ি একটা মুহূর্তে গল্পের পাতায় ঢুকে পড়েছে।
শহর দর্শনের শুরু কলেজ স্ট্রিট থেকে। বইয়ের গন্ধে মাতাল সেই রাস্তায় সান্তাকে দেখে বইয়ের দোকানের দাদারাও খিলখিলিয়ে উঠলেন। কফি হাউসের সিঁড়ির ধাপ ধরে বসে থাকা ছাত্রছাত্রীরা মোবাইল তুলে ধরল, কেউ চুপিচুপি বলল, এ কলকাতা, এখানে সবই সম্ভব! সান্তা জানালার ধারে দাঁড়িয়ে ট্রামের ঘণ্টা বাজিয়ে দিলেন টিং টিং! সেই শব্দেই যেন বড়দিনের ছন্দ ফুটে উঠল শহরের বুকজুড়ে।
ট্রাম ছেড়ে এবার সান্তার গন্তব্য মেট্রো। ব্যস্ত প্ল্যাটফর্মে তাঁর পা পড়তেই আগে একটু গুঞ্জন, তারপর হাসি কেউ ছবি তুলছে, কেউ ভিডিও করছে, কেউবা কেবল মুখভরা বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে। ভিড়ের মধ্যে সান্তা নিজের মতো করে হাত বাড়িয়ে মানুষের সঙ্গে হাত মিলাচ্ছেন, বাচ্চাদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। তাঁর ব্যাগ থেকে বেরিয়ে আসছে ছোট্ট চকোলেট, আর মেট্রোর একঘেয়েমি মুহূর্তে রূপ নিচ্ছে উৎসবের মেলায়।
এক কোণে বসে থাকা এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক হেসে বললেন, শহরটা এখনও জাদুতে ভরা, শুধু মনে করিয়ে দেওয়ার মানুষ লাগে। সান্তা মাথা নাড়লেন। সেই মুহূর্তে তাঁর চোখে শহরটার প্রতি এক অদ্ভুত স্নেহের ঝিলিক দেখা গেল, যেন কলকাতার হাসিই তাঁর সবচেয়ে বড় পাওনা।
মেট্রো থেকে বেরিয়ে সান্তা ঢুকলেন এক সরু গলিতে। কয়েকটি বাচ্চা সেখানে ফুটপাতে খেলা করছিল, হাতের বল, ছেঁড়া জামা, কিন্তু চোখে স্বপ্নের আলো। সান্তাকে দেখে প্রথমে একটু কুণ্ঠা, তারপর হাসতে হাসতে তারা এগিয়ে এল। সান্তা তাদের হাত ধরে বললেন, “বড়দিন মানে সবার মুখে হাসি।” আর সত্যিই সেই মুহূর্তে গলিটা যেন আলোকময় হয়ে উঠল।
শহর দর্শনের শেষে সান্তা আবার উঠলেন সেই পুরোনো ট্রামে। ট্রামটি ধীরে ধীরে এগোতে লাগল, আর জানালা দিয়ে সান্তা হাত নেড়ে শহরকে বিদায় জানালেন। কলকাতা যেন সাড়া দিল, হাওয়াটা একটু নরম হল, আলো একটু উজ্জ্বল, মানুষের মুখে হাসি একটু গভীর।
এই সান্তা কে? তার কোনও ঠিকানা নেই, কোনও উত্তরই নেই। জানা জরুরি নয়ও। কারণ বড়দিনের আগের এই ক্ষণিক যাত্রা শহরকে মনে করিয়ে দিল আনন্দ ছড়াতে বড় প্রস্তুতি লাগে না; লাগে কেবল একটু সদ্ভাব, একটু যত্ন, আর মনভরা হাসি।
হয়তো আগামী বড়দিনে আবার কোনও ট্রামের জানালা দিয়ে হাত নেড়ে তিনি বলবেন, “Merry Christmas, Kolkata!”
