
স্নিগ্ধা চৌধুরী
কলকাতার ফুটবলপ্রেম মানেই আবেগ, ইতিহাস আর গর্বের উত্তরাধিকার। সেই শহরেই লিওনেল মেসির মতো এক জীবন্ত কিংবদন্তির আগমন স্বপ্নের মতো হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে সেই স্বপ্ন ধাক্কা খেয়েছে বাস্তবের কঠিন দেওয়ালে। মেসিকে ঘিরে যে উন্মাদনা, তা যেমন সত্য, তেমনই সত্য সেই উন্মাদনার ব্যবস্থাপনাহীন রূপ, যা শেষ পর্যন্ত দর্শকের প্রাপ্য আনন্দ কেড়ে নিয়েছে।
একদিকে হাজার হাজার টাকা দিয়ে টিকিট কাটা সাধারণ দর্শক, অন্যদিকে ক্ষমতার অলিন্দে ঘোরাফেরা করা মুখ, ক্যামেরা আর আত্মপ্রচারের ভিড়। মেসির উপস্থিতি যেন ফুটবলের উৎসব না হয়ে উঠেছিল ক্ষমতার প্রদর্শনী। মাঠে নেমে পায়ের জাদু দেখানোর আগেই তিনি পরিণত হন ভিআইপি ঘেরাটোপের কেন্দ্রে। গ্যালারিতে বসে থাকা দর্শক তখন জায়ান্ট স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থেকেও বুঝে উঠতে পারছিলেন না, এই আয়োজন আদৌ তাঁদের জন্য কিনা।
এই ছবির সঙ্গে স্বাভাবিক ভাবেই ফিরে আসে অতীতের তুলনা। মারাদোনার কলকাতা সফরের স্মৃতি টেনে এনে এক দর্শকের কথায় যেন ধরা পড়ে গেল সময়ের তফাত। তখনকার ক্রীড়ামন্ত্রী সুভাষ চক্রবর্তীর উপস্থিতি ছিল নীরব কিন্তু দৃঢ়। তাঁকে কখনও মঞ্চের আলো কাড়তে হয়নি, ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে প্রমাণ করারও দরকার পড়েনি। কারণ আয়োজনটাই ছিল মুখ্য, ব্যক্তি নয়। বিমানবন্দর থেকে যুবভারতী পর্যন্ত মানুষের ঢল থাকলেও কোথাও বিশৃঙ্খলা হয়নি, কোথাও দর্শক নিজেকে বঞ্চিত মনে করেনি।
আজকের চিত্র তার ঠিক উল্টো। মেসির মতো তারকাকে ঘিরে যেখানে ফুটবল হওয়ার কথা, সেখানে সামনে চলে এসেছে নেতা-মন্ত্রীর ভিড়, ছবি তোলার তাড়াহুড়ো আর প্রোটোকলের চাপ। সেই তুলনাতেই দর্শকদের মনে পড়ছে সুভাষ চক্রবর্তীর নাম। তিনি বুঝতেন, বড় খেলোয়াড় মানেই বড় আয়োজন নয়, বড় দায়িত্বও। তাঁর সময় ক্রীড়ামন্ত্রী মানে ছিলেন আড়ালের সংগঠক, সামনের সারির নায়ক নয়।
হায়দরাবাদে একই সফরের অন্য ছবি দেখা গিয়েছে। সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা, দর্শককেন্দ্রিক পরিকল্পনা আর মাঠে ফুটবলারের জন্য পরিসর। সেখানে মেসি ছিলেন ফুটবলার, কলকাতায় তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক দুর্লভ ট্রফি, যাকে ঘিরে ধরাই যেন ছিল প্রধান লক্ষ্য। এই দুই শহরের অভিজ্ঞতা আসলে ব্যবস্থার ফারাকটাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
যুবভারতীর বিশাল গ্যালারিতে জমে ওঠা ক্ষোভ তাই শুধু একজন ফুটবলারকে না দেখতে পাওয়ার হতাশা নয়। তা আসলে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা প্রশ্নের বিস্ফোরণ। বড় ইভেন্ট মানেই কি সাধারণ দর্শক উপেক্ষিত থাকবে। তারকা আনলেই কি আয়োজন সফল হয়, নাকি তারকাকে দেখানোর দায়িত্বও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কলকাতার ফুটবল সংস্কৃতি কখনও দর্শককে পেছনের সারিতে বসায়নি, কিন্তু এই দিনটি সেই সংস্কৃতির সঙ্গে বেমানান হয়ে রইল।
মেসি হয়তো কয়েক ঘণ্টার অতিথি ছিলেন, কিন্তু রেখে গেলেন এক দীর্ঘ বিতর্ক। এই বিতর্ক শুধুই দোষারোপের নয়, আত্মসমালোচনারও। ভবিষ্যতে কলকাতা যদি আবার বিশ্ব ফুটবলের মঞ্চে নিজেকে তুলে ধরতে চায়, তবে তাকে ফিরতে হবে নিজের মূল চেতনায়। যেখানে ফুটবল থাকবে কেন্দ্রে, ক্ষমতা নয়। যেখানে স্মৃতির কেন্দ্রে থাকবে মাঠের মুহূর্ত, গ্যালারির আনন্দ, আর দর্শকের প্রাপ্য সম্মান। তবেই মেসির আলো সত্যিকারের আলো হয়ে উঠবে, ছায়া নয়।
