
কলকাতায় মেসির আগমন ঘিরে যা ঘটল, তা শুধু একটি ব্যর্থ অনুষ্ঠান নয়, এটি আমাদের প্রশাসনিক অদক্ষতা, রাজনৈতিক সুবিধাবাদ এবং বাণিজ্যিক লোভের নগ্ন প্রদর্শন। বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলারের নাম ব্যবহার করে যে স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত হাজার হাজার সাধারণ মানুষের জন্য অপমান, হতাশা এবং আর্থিক ক্ষতির গল্প হয়ে দাঁড়াল। এই ঘটনা কোনও বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়, এটি দীর্ঘদিন ধরে চলা এক বিকৃত ব্যবস্থার ফল।
১০ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা দিয়ে চারটি ক্যাটাগরিতে টিকিট কেটে মানুষ এসেছিলেন শুধুমাত্র এক ঝলক মেসিকে দেখার আশায়। কেউ দূর জেলা থেকে, কেউ আবার সারা জীবনের সঞ্চয় ভেঙে। কিন্তু বাস্তবে তারা পেলেন বিশৃঙ্খলা, ধাক্কাধাক্কি, অমানবিক ভিড় এবং শেষে শূন্যতা। মাঠে উপস্থিত থেকেও মেসির চোখের দেখা না পাওয়া এক চরম ব্যর্থতা, যা কোনওভাবেই ক্ষমার যোগ্য নয়।
যেখানে রাজনৈতিক নেতা ও প্রভাবশালীরা নির্বিঘ্নে মেসির সঙ্গে ছবি তুলতে ব্যস্ত ছিলেন। যাদের জন্য অনুষ্ঠান, তারা অবহেলিত; আর যাদের প্রয়োজন ছিল না, তারাই সব সুবিধা ভোগ করলেন। এটি স্পষ্ট করে দেয়, এই আয়োজন সাধারণ মানুষের জন্য নয়, ক্ষমতা প্রদর্শনের মঞ্চ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
২০০ টাকা দিয়ে এক বোতল জল কিনতে বাধ্য হওয়া কোনও স্বাভাবিক পরিস্থিতি নয়, এটি সরাসরি শোষণ। ভিড়ের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকা মানুষদের জন্য বিশুদ্ধ পানীয় জল সরবরাহ করতে না পারা আয়োজকদের চরম ব্যর্থতা। প্রশাসন চোখ বন্ধ করে থেকেছে, আর আয়োজকরা সুযোগ নিয়েছে। এর দায় কেউই নিতে চাইছে না, সবাই দায় এড়ানোর খেলায় মেতেছে।
আরও ভয়ঙ্কর হলো, ঘটনার পরও কোনও আত্মসমালোচনা নেই। আয়োজক সংস্থা, ক্রীড়া সংগঠন, প্রশাসন সবাই একে অন্যের দিকে আঙুল তুলছে। কিন্তু যে দর্শকরা প্রতারিত হলেন, যারা মানসিকভাবে ভেঙে পড়লেন, তাদের কথা কেউ ভাবছে না। টাকা ফেরতের আশ্বাসও যেন কেবল পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার কৌশল, কোনও নৈতিক দায়বদ্ধতার প্রকাশ নয়।
এই ঘটনা কলকাতার ক্রীড়া সংস্কৃতির ওপর এক কালো দাগ। যে শহর নিজেকে ফুটবলের শহর বলে গর্ব করে, সেই শহরই একজন কিংবদন্তি ফুটবলারের আগমনকে এমনভাবে কলঙ্কিত করল। ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক মানের কোনও ইভেন্ট আয়োজনের ক্ষেত্রে এই ব্যর্থতা দীর্ঘদিন মনে রাখা হবে। আস্থা ভাঙলে তা ফেরানো কঠিন, আর এই আয়োজনে সেই আস্থাই চূর্ণ হয়েছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এই ঘটনার পর আদৌ কি কোনও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নাকি আবারও কয়েকদিনের শোরগোলের পর সব চাপা পড়ে যাবে। যদি দোষীদের শাস্তি না হয়, যদি দর্শকদের প্রতি এই অবহেলার কোনও জবাবদিহি না থাকে, তবে ভবিষ্যতেও সাধারণ মানুষই প্রতারিত হবেন। মেসি এসেছিলেন ফুটবলের উৎসব নিয়ে, কিন্তু তিনি রেখে গেলেন এক তিক্ত অভিজ্ঞতা, যা আমাদের ব্যবস্থার অসাড়তা আর নিষ্ঠুর বাস্তবতাকেই সামনে এনে দিল।
