
বর্তমান যুগে ‘সেলিব্রিটি’ বা তারকা সংস্কৃতি আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রুপালি পর্দার নায়ক-নায়িকা, মাঠ কাঁপানো ক্রিকেটার কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ইনফ্লুয়েন্সার—এঁদের প্রতিটি পদক্ষেপ আজ সাধারণ মানুষের কাছে এক বিশেষ বার্তা বহন করে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই তারকা খ্যাতির মোহ ও প্রভাব কতদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়া উচিত? জনদায়িত্ব বা সামাজিক কর্তব্যের কাছে এসে কি এই প্রভাবের কোনো সীমারেখা থাকা প্রয়োজন?তারকাদের প্রতি সাধারণ মানুষের, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের এক ধরনের অন্ধ আবেগ কাজ করে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, একজন তারকা যে ব্র্যান্ডের পোশাক পরছেন বা যে জীবনধারা অনুসরণ করছেন, ভক্তরা বিচার-বুদ্ধি হারিয়ে তা-ই অনুকরণ করার চেষ্টা করেন। এখানেই তৈরি হয় নৈতিক সংকটের জায়গা। যখন কোনো তারকা নিছক অর্থের লোভে ক্ষতিকর পণ্য—যেমন অনলাইন জুয়া, তামাক বা অস্বাস্থ্যকর পানীয়র প্রচার করেন, তখন তাঁর সেই ‘সেলিব্রিটি প্রভাব’ সমাজের জন্য আশীর্বাদের চেয়ে অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায় বেশি।
একজন তারকার জনপ্রিয়তার মূলে থাকে সাধারণ মানুষের ভালোবাসা। তাই সমাজের প্রতি তাঁদের এক ধরণের অলিখিত দায়বদ্ধতা বা জনদায়িত্ব তৈরি হয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়ানো, সচেতনতামূলক প্রচারণায় অংশ নেওয়া কিংবা ভুল তথ্যের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো—এগুলো একজন আদর্শ তারকার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। বিশ্বজুড়ে বহু তারকা ইউনিসেফ বা বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার দূত হিসেবে কাজ করে সমাজ সংস্কারে বড় ভূমিকা রাখছেন। এটি তারকা সংস্কৃতির ইতিবাচক দিক।
তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। অনেক সময় দেখা যায়, তারকারা তাঁদের ব্যক্তিজীবন বা বিতর্কিত মতামতকে জনসম্মুখে এমনভাবে উপস্থাপন করেন, যা সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অবাধ প্রসারের ফলে আজ তারকাদের ব্যক্তিগত মতামত মুহূর্তেই গণমানুষের মতামতে পরিণত হতে পারে। এই প্রচণ্ড ক্ষমতা যদি দায়িত্বশীলতার সাথে ব্যবহার না করা হয়, তবে তা হিতে বিপরীত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।তাহলে এই প্রভাব থামবে কোথায়? উত্তরটি হলো—ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং নৈতিক দায়বদ্ধতার ভারসাম্যস্থলে। একজন তারকার অবশ্যই ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ প্রকাশের অধিকার আছে, কিন্তু সেটি যেন কোনোভাবেই জনস্বার্থের পরিপন্থী না হয়। তারকা খ্যাতিকে যখন কেবল পুঁজি বা অর্থ উপার্জনের হাতিয়ার হিসেবে দেখা হয়, তখনই জনদায়িত্বের বিষয়টি আড়ালে চলে যায়।
পরিশেষে বলা যায়, তারকা সংস্কৃতি ও জনদায়িত্ব একে অপরের প্রতিপক্ষ নয়, বরং পরিপূরক হওয়া উচিত। ভক্তদেরও উচিত অন্ধ অনুকরণ না করে সুস্থ বিচারবোধ প্রয়োগ করা। তারকারা যদি তাঁদের প্রভাবকে ইতিবাচক পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন এবং সাধারণ মানুষ যদি সস্তা মোহের ঊর্ধ্বে উঠে সত্যকে গ্রহণ করতে শেখে, তবেই সমাজ এক সুস্থ সংস্কৃতির দিকে এগিয়ে যাবে। এই সীমারেখাটি কোনো আইন দিয়ে নয়, বরং নৈতিকতা এবং বিবেক দিয়েই সমাধান সম্ভব।।
