
(রমেন্দ্র গোস্বামী)
স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের সহজলভ্যতার ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আজ আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ, ইউটিউব কিংবা শর্ট ভিডিও প্ল্যাটফর্ম—সব মিলিয়ে যোগাযোগ যেমন দ্রুত ও সহজ হয়েছে, তেমনই নীরবে মাথাচাড়া দিচ্ছে এক নতুন সামাজিক সংকট—সামাজিক মাধ্যমে আসক্তি। বিশেষত শিশু-কিশোর ও যুবসমাজ এই আসক্তির সবচেয়ে বড় শিকার। এই নীরব সংকট অনেক ক্ষেত্রে মানসিক বিপর্যয় ডেকে আনছে, এমনকি কারও কারও প্রাণও নিরবে কেড়ে নিচ্ছে।সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে ‘ভাইরাল’ হওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা আজ সমাজের এক ভয়ংকর বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। লাইক, শেয়ার ও ফলোয়ারের সংখ্যাকে সাফল্যের মাপকাঠি হিসেবে ধরা হচ্ছে। এই অসুস্থ প্রতিযোগিতায় অনেকেই নিজের নিরাপত্তার পাশাপাশি অন্যের জীবনকেও ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। বিনোদনের নামে বিপজ্জনক স্টান্ট, রাস্তায় ঝুঁকিপূর্ণ ভিডিও শুটিং কিংবা কাউকে হেনস্থা করে কনটেন্ট তৈরি—সব মিলিয়ে ভাইরাল হওয়ার নেশা ক্রমেই মৃত্যুফাঁদে পরিণত হচ্ছে।বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক স্বীকৃতি পাওয়ার এই তীব্র বাসনা মানসিক বিকৃতির জন্ম দিচ্ছে। তরুণ প্রজন্মের একাংশ ঝুঁকিপূর্ণ কাজকে ‘চ্যালেঞ্জ’ বা ‘ট্রেন্ড’ ভেবে গ্রহণ করছে। চলন্ত ট্রেনের সামনে ভিডিও তোলা, উঁচু ভবনের কার্নিশে দাঁড়িয়ে রিল বানানো কিংবা জনবহুল রাস্তায় বিপজ্জনক কাণ্ড—এসব ঘটনার পেছনে রয়েছে ভাইরাল হওয়ার উন্মাদনা। এর ফলে শুধু কনটেন্ট নির্মাতাই নয়, আশপাশের সাধারণ মানুষও দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক মাধ্যমে অতিরিক্ত সময় ব্যয় মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার ফলে চোখের সমস্যা, ঘুমের ব্যাঘাত, মাথাব্যথা, স্থূলতা ও শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা বাড়ছে। পাশাপাশি ‘লাইক’, ‘কমেন্ট’ ও ‘ভিউ’-এর সংখ্যার ওপর নির্ভরশীলতা তৈরি হওয়ায় আত্মসম্মানবোধ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তুলনামূলক সাফল্যের ভ্রান্ত ধারণা থেকে অনেকেই হতাশা, উদ্বেগ ও একাকিত্বে ভুগছেন; কারও কারও ক্ষেত্রে তা আত্মহানির প্রবণতাও বাড়িয়ে দিচ্ছে।শিক্ষাক্ষেত্রেও সামাজিক মাধ্যমে আসক্তির নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট। পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যাওয়া, স্মৃতিশক্তি দুর্বল হওয়া এবং পরীক্ষার ফলাফলে অবনতি—এসবই অতিরিক্ত স্ক্রিন-টাইমের ফল হিসেবে ধরা পড়ছে। অভিভাবকদের অভিযোগ, সন্তানরা বইয়ের চেয়ে মোবাইলেই বেশি সময় কাটাচ্ছে। ফলে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবক-সন্তানের মধ্যে যোগাযোগে দূরত্ব বাড়ছে, কমছে পারস্পরিক কথোপকথন ও আবেগের আদান-প্রদান।সমাজে এর প্রভাব আরও গভীর ও বহুমাত্রিক। ভুয়ো খবর, গুজব ও বিদ্বেষমূলক কনটেন্ট দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক উত্তেজনা ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। সাইবার বুলিং, অনলাইন প্রতারণা, পরিচয় চুরি ও গোপনীয়তা লঙ্ঘনের ঘটনাও উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। বাস্তব জীবনের সামাজিকতা ও সহমর্মিতা কমে গিয়ে মানুষ ক্রমশ ভার্চুয়াল জগতে আবদ্ধ হয়ে পড়ছে, যা সামাজিক বন্ধনকে দুর্বল করছে।এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সমন্বিত সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। অভিভাবকদের উচিত সন্তানদের স্ক্রিন-টাইম নিয়ন্ত্রণ করা, নিরাপদ অনলাইন আচরণ শেখানো এবং খেলাধুলা ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে উৎসাহিত করা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ডিজিটাল সাক্ষরতা, অনলাইন নৈতিকতা ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি ব্যক্তিগত পর্যায়ে নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার না করা, নিয়মিত বিশ্রাম নেওয়া, শারীরিক ব্যায়াম করা এবং বাস্তব সামাজিক যোগাযোগ বাড়ানোই হতে পারে এই সংকট মোকাবিলার কার্যকর পথ।সব মিলিয়ে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সুফল গ্রহণের পাশাপাশি এর অপব্যবহার রোধে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সমাজের সমষ্টিগত উদ্যোগই পারে এই নতুন সামাজিক সংকট থেকে আমাদের রক্ষা করতে।
