
শান্তিনিকেতনের ৭ই পৌষের ভোরটা আসে নিঃশব্দ পায়ে। তখন আকাশ এখনও পুরো জেগে ওঠেনি, কুয়াশার আবরণে ঢাকা আশ্রমপ্রাঙ্গণ, গাছের পাতায় জমে থাকা শিশিরে শীতের নরম ঝিলিক। বাতাসে মাটির গন্ধ, দূরে কোথাও পাখির ডানার শব্দ। এই ভোরে মনে হয়, সময় একটু ধীরে হাঁটছে, যেন আজ তাড়াহুড়োর কোনো জায়গা নেই। আজ যে পৌষ উৎসবের শুরু।
এই নীরবতার বুক চিরে ধীরে ধীরে ভেসে আসে বৈতালিকের সুর। আশ্রমের পথে পথে সেই গান এগিয়ে চলে, আর তার সঙ্গে উঠে আসে ‘আমার মুক্তি আলোয় আলোয়’। গানটা শুধু কানে পৌঁছয় না, গিয়ে মিশে যায় আকাশের রঙে, কুয়াশার ভাঁজে, মানুষের নিঃশ্বাসে। ভোরের আকাশে তখনও কিছু আলো-অন্ধকারের খেলায় তারা যেন লুকিয়ে থাকে, আর মনে হয় গান আর আকাশ একে অপরকে চিনে নিয়েছে। ছাত্রছাত্রীদের কণ্ঠে এই গান হয়ে ওঠে জাগরণের আহ্বান, গভীর কৃতজ্ঞতার প্রার্থনা।
সাদা শাড়ি আর সাদা পাঞ্জাবিতে একে একে মানুষ এসে জড়ো হয়। রঙের কোনো প্রয়োজন নেই আজ, কারণ সাদাতেই রয়েছে সব রঙের শান্ত মিলন। এখানে পরিচয়ের ভার হালকা হয়ে যায়। শিক্ষক, ছাত্র, আশ্রমবাসী, অতিথি সবাই একই ভোরের আলোয় দাঁড়িয়ে থাকে। এই সাদা পোশাকের ভেতরে যেন এক ধরনের নীরব সৌন্দর্য, যা চোখে নয়, হৃদয়ে ধরা দেয়।
বৈতালিকের সুর আশ্রমের পথ পেরিয়ে ধীরে ধীরে প্রকৃতির মধ্যে মিলিয়ে যায়। গাছেরা নীরব শ্রোতা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, মাটিও যেন সেই সুর ধরে রাখে। মনে হয় গানটা শেষ হয়ে গেলেও তার রেশ থেকে যায়, দীর্ঘশ্বাসের মতো, স্পর্শের মতো। এই মুহূর্তে মানুষ নিজের ভেতরে একটু ঢুকে পড়ে, প্রতিদিনের ক্লান্তির ভার নামিয়ে রাখে মাটির ওপর।
তারপর আসে ব্রহ্মউপাসনার নীরব সময়। খোলা আকাশের নীচে সবাই বসে পড়ে, কোনো প্রাচীর ছাড়া, কোনো আড়াল ছাড়া। আলো, বাতাস, পাখির ডাক সবকিছুই উপাসনার অংশ হয়ে ওঠে। শব্দের চেয়ে অনুভব এখানে অনেক গভীর। চোখ বন্ধ করলে মনে হয় নিজের হৃদয়ের সঙ্গে কথা হচ্ছে, চোখ খুললে মনে হয় আকাশটাই আশীর্বাদ ছড়িয়ে দিচ্ছে। এই নীরবতার মধ্যে মানুষ নিজেকে খুঁজে পায় নতুন করে।
এই ভোরে বসে মনে হয়, কত বছর ধরে এই একই সকাল ফিরে আসছে। সময় বদলায়, পৃথিবী বদলায়, তবু ৭ই পৌষের শান্তিনিকেতন বদলায় না। এখানেই তার আশ্রয়, এখানেই তার শক্তি। এখানে উৎসব মানে কোলাহল নয়, উৎসব মানে ধীরে হওয়া, গভীরভাবে অনুভব করা।
সূর্য ধীরে ধীরে ওপরে ওঠে, কুয়াশা সরে যায়, আলো আরও পরিষ্কার হয়। কিন্তু বৈতালিকের সুর আর ব্রহ্মউপাসনার নীরবতা সারাদিন ধরে মনের মধ্যে বাজতে থাকে। মনে হয় এই ভোরটা শুধু একটি সকাল নয়, এটা এক ধরনের আলো, যা সারা বছরের পথ দেখিয়ে দেয়।
শান্তিনিকেতনের ৭ই পৌষ তাই শুধু পৌষ উৎসবের সূচনা নয়। এটি এক আত্মিক ফিরে আসা। সাদা শাড়ি আর পাঞ্জাবির সারল্যের মধ্যে, গানের সুর আর নীরব প্রার্থনার ভেতর দিয়ে মানুষ আবার নিজের কাছে ফিরে আসে। এই ভোর একবার যে অনুভব করে, তার মনে এই সকাল চিরদিনের মতো থেকে যায় নরম আলো হয়ে, শান্ত নিঃশ্বাস হয়ে, গভীর ভালোবাসার মতো।
