
পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী ইতিহাসে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসটি একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। ভারতীয় নির্বাচন কমিশন পরিচালিত ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (SIR) বা নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধনের যে খসড়া রিপোর্ট সামনে এসেছে, তা এক কথায় নজিরবিহীন। প্রায় ৫৮ লক্ষ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়া এবং আরও দেড় কোটি ভোটারকে সন্দেহের তালিকায় রাখা—গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় এক বিশাল আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে, ২০০২ সালের তালিকার সঙ্গে সংযোগহীন (Unmapped) যে ৩০ লক্ষ ভোটার বাদ পড়েছেন, তাঁদের ভবিষ্যৎ এখন এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে।
নির্বাচন কমিশনের দাবি অনুযায়ী, এই প্রক্রিয়াটি মূলত মৃত, অনুপস্থিত এবং ডুপ্লিকেট বা দ্বৈত ভোটারদের বাদ দিয়ে একটি স্বচ্ছ ও নির্ভুল তালিকা তৈরির লক্ষ্যে পরিচালিত হয়েছে। প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ ব্যবহার করে তথ্য যাচাইয়ের এই নিবিড় পদ্ধতি ভোটার তালিকার ‘শুদ্ধিকরণ’-এর জন্য জরুরি। কিন্তু গোলমালের জায়গাটি হলো ‘২০০২ সালের সংযোগহীনতা’। এই ৩০ লক্ষ ভোটার এমন এক সময়ে বাদ পড়লেন যখন বাংলার রাজনীতিতে ‘বহিরাগত’ এবং ‘নাগরিকত্ব’ ইস্যু চরম স্পর্শকাতর।
কমিশনের তথ্য বলছে, এই ৩০ লক্ষ মানুষের তথ্য ২০০২ সালের পুরনো ডেটাবেসের সঙ্গে মেলেনি। ফলে তাঁদের বর্তমান অস্তিত্ব বা বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যদিও এই নাম বাদ পড়ার পেছনে মৃত্যু বা স্থানান্তর একটি বড় কারণ, তবুও এত বিশাল সংখ্যায় নাম কাটা যাওয়া প্রশাসনিক তৎপরতা ও জনগণের সচেতনতার অভাবকেই প্রকট করে তোলে।
কী হবে এই ৩০ লক্ষ ভোটারের?
খসড়া তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া মানেই নাগরিকত্বের অধিকার হারানো নয়, কিন্তু এটি ভোটাধিকার হারানোর প্রথম ধাপ। কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী:
- আপত্তি ও দাবি (Claims and Objections): নাম বাদ পড়া ব্যক্তিদের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যথাযথ প্রমাণপত্র (আধার কার্ড, বিদ্যুৎ বিল বা অন্যান্য সরকারি পরিচয়পত্র) নিয়ে বিএলও (BLO)-র কাছে আবেদন করতে হবে।
- প্রমাণের দায়: যদি কোনো ভোটার প্রমাণ করতে ব্যর্থ হন যে তিনি ওই এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন বা তাঁর নাম ভুলবশত বাদ গেছে, তবে চূড়ান্ত তালিকা থেকে তিনি পাকাপাকিভাবে বাদ পড়বেন।
- রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব: ৩০ লক্ষ ভোটারের ভবিষ্যৎ কেবল ব্যক্তিগত স্তরে সীমাবদ্ধ নেই। রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে এটি এখন ভোটব্যাঙ্ক রক্ষার লড়াই। বুথ স্তরে যদি দলগুলো সক্রিয় না হয়, তবে বহু সাধারণ মানুষ আইনি বা প্রশাসনিক জটিলতার কারণে ভোটাধিকার হারাবেন।
তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে যখন গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব ও হুমায়ুন কবীরের মতো নেতাদের নতুন দল গঠন নিয়ে ডামাডোল চলছে, তখন এই ভোটার তালিকার ইস্যুটি বিজেপি বা অন্যান্য বিরোধীদের কাছে একটি বাড়তি অস্ত্র। বিজেপি একে ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’দের বাদ পড়ার জয় হিসেবে দেখছে, অন্যদিকে শাসকদল একে সাধারণ মানুষকে হেনস্থা করার ষড়যন্ত্র হিসেবে চিহ্নিত করতে পারে।
গণতন্ত্রের হৃদস্পন্দন হলো ভোট। সেই ভোটের তালিকা থেকে যদি লক্ষ লক্ষ মানুষ বাদ পড়েন, তবে তা কেবল যান্ত্রিক ‘শুদ্ধিকরণ’ নয়, বরং একটি বড় সামাজিক সংকটের ইঙ্গিত দেয়। মৃত বা ভুয়ো ভোটার বাদ যাওয়া কাম্য, কিন্তু একজনও প্রকৃত নাগরিক যেন যান্ত্রিক ত্রুটি বা প্রমাণের অভাবে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত না হন, তা নিশ্চিত করা নির্বাচন কমিশনের প্রাথমিক দায়িত্ব। এই ৩০ লক্ষ মানুষের ভবিষ্যৎ এখন নির্ভর করছে তাঁদের নিজস্ব সচেতনতা এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতার ওপর। ২০২৬-এর আগে এই শুদ্ধিকরণ অভিযান বাংলার ক্ষমতার বিন্যাসকে আমূল বদলে দিতে পারে।।
