
নীলাঞ্জন দাশগুপ্ত
বাংলাদেশে আজ হিন্দুদের উপর যে অকথ্য অত্যাচারের ছবি উঠে আসছে, তা শুধু একটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের যন্ত্রণা নয়, এটি মানবতার মুখে ছুড়ে মারা এক নির্মম প্রশ্নচিহ্ন। দীপু দাসকে পুড়িয়ে মারার ঘটনা সেই নৃশংসতার চূড়ান্ত প্রকাশ, যেখানে মানুষ নামের পরিচয়টুকুও যেন পুড়ে ছাই হয়ে যায়। কীভাবে একজন মানুষ আরেকজন মানুষকে আগুনে পুড়িয়ে মারতে পারে, কীভাবে ধর্মের নামে ঘৃণাকে এতটা নির্লজ্জ করে তোলা যায়, সেই প্রশ্ন আজ বিবেকবান প্রতিটি মানুষের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে। এই অত্যাচার কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি দীর্ঘদিনের ভয়, লাঞ্ছনা, নিরাপত্তাহীনতার ধারাবাহিক পরিণতি, যেখানে সংখ্যালঘু পরিচয়টাই হয়ে ওঠে অপরাধ।
আগুন শুধু দীপু দাসের শরীর পোড়ায়নি, পুড়িয়েছে বিশ্বাস, পুড়িয়েছে সহাবস্থানের স্বপ্ন, পুড়িয়েছে সভ্যতার মুখোশ। যে সমাজে মানুষকে জীবন্ত জ্বালিয়ে দেওয়া যায়, সেখানে ন্যায়বিচার শব্দটি কেবল কাগজে বেঁচে থাকে। প্রতিবেশীর ঘর, মন্দির, স্মৃতি আর ইতিহাসের উপর আঘাত নতুন কিছু নয়, কিন্তু প্রতিবারই রাষ্ট্রযন্ত্রের নীরবতা এই অপরাধকে আরও সাহসী করে তোলে। ভয়কে অস্ত্র বানিয়ে একটি জনগোষ্ঠীকে কোণঠাসা করার এই কৌশল শুধু বাংলাদেশ নয়, গোটা উপমহাদেশের সামাজিক সুস্থতার জন্য বিপজ্জনক।
এই অমানবিক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বিক্ষোভে ফেটে পড়েছে বঙ্গীয় হিন্দু জাগরণ মঞ্চ। এই বিক্ষোভ কেবল ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয়, এটি এক চিৎকার, যা সীমান্ত পেরিয়ে পৌঁছাতে চায় বিবেকের দরজায়। রাস্তায় নামা মানুষের চোখে জল, কণ্ঠে রাগ, মুঠিতে প্রতিবাদ। তারা জানে নীরবতা মানে সহমতি, আর সহমতি মানে আরও দীপু দাসের জন্ম। এই প্রতিবাদ মনে করিয়ে দেয় যে ইতিহাসে যখনই সংখ্যালঘুদের উপর আঘাত নেমেছে, তখনই সমাজের নৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে পড়েছে।
আজ প্রশ্ন উঠছে রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে, আইনের কার্যকারিতা নিয়ে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার দায় নিয়ে। কেবল শোকবার্তা আর কূটনৈতিক সৌজন্য দিয়ে কি আগুন নেভানো যায়। যে আগুন মানুষের শরীর পোড়ায়, সেই আগুন নেভাতে লাগে ন্যায়বিচারের জল, নিরাপত্তার আশ্বাস, অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। না হলে ঘৃণার আগুন ছড়িয়ে পড়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো মানুষের পাশে দাঁড়ানো, ভয় ভাঙানো, সত্যকে জোরে বলা। ধর্মের পরিচয় কোনো অপরাধ হতে পারে না, বিশ্বাসের কারণে কাউকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া কোনো সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য নয়। দীপু দাসের নাম আজ একটি প্রতীক, সেই সব মুখের প্রতীক যারা কথা বলার সুযোগ পায়নি। বঙ্গীয় হিন্দু জাগরণ মঞ্চের বিক্ষোভ সেই নিঃশব্দ মানুষের কণ্ঠস্বর। এই কণ্ঠস্বর থামলে আগুন জিতবে, আর কণ্ঠস্বর জাগ্রত থাকলে একদিন মানবতাই শেষ কথা বলবে।
