
রমেন্দ্র গোস্বামী
বছরের শেষ প্রান্তে এসে বড়দিন মানেই আলো, সাজসজ্জা, কেকের মিষ্টি গন্ধ আর প্রার্থনার শান্ত সুর। চার্চের সামনে ঝলমলে আলোর রোশনাই, শিশুদের মুখে হাসি, পরিবার– পরিজনের সঙ্গে উৎসবের আনন্দ—সব মিলিয়ে বড়দিন সাধারণত নিয়ে আসে এক প্রশান্তির বার্তা। কিন্তু এবছর সেই আনন্দের ছবির পাশেই ভেসে উঠছে আরেকটি কঠোর বাস্তবতা—সীমান্তে বারুদের গন্ধ। উৎসবের আবহে তাই যেন কোথাও একটা অস্বস্তির ছায়া, আনন্দে পড়ছে ভাটা।উত্তর-পূর্ব ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলিতে সাম্প্রতিক উত্তেজনা নতুন কিছু নয়। ভারত–বাংলাদেশ সীমান্তে অনুপ্রবেশ, চোরাচালান, সীমান্ত সংঘর্ষ কিংবা গুলির শব্দ—এসব ঘটনা মাঝেমধ্যেই খবরের শিরোনাম হয়।কিন্ত এবার ঠিক ব্যতিক্রম, বড়দিনের ঠিক আগমুহূর্তে সেই চেনা আতঙ্কের পাশাপাশি যুদ্ধের সাজসজ্জার ভাব যেন মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। সীমান্তে কর্তব্যরত নিরাপত্তা বাহিনীর জওয়ানরা যখন পরিবার থেকে দূরে দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছেন, তখন শহরের কনফেকশনারিতে সাজানো কেক আর উপহারের প্যাকেট যেন এক ভিন্ন পৃথিবীর গল্প বলে। ত্রিপুরার সীমান্ত ঘেঁষা এলাকায় বসবাসকারী সাধারণ মানুষদের অনুভূতিও দ্বিধাবিভক্ত। একদিকে তাঁরা বড়দিনের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত—ঘর সাজানো, কেক কেনা, চার্চে যাওয়ার পরিকল্পনা। অন্যদিকে সীমান্তে গুলির খবর, বিএসএফ জওয়ানের আহত হওয়ার সংবাদ বা অশান্তির গুঞ্জন তাঁদের মনে ভয় ঢুকিয়ে দিচ্ছে। উৎসবের রাতে হঠাৎ কোনও অপ্রীতিকর ঘটনার আশঙ্কা যেন মন থেকে পুরোপুরি দূর হচ্ছে না।খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের কাছে বড়দিন কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি মানবতা, শান্তি ও ভালোবাসার প্রতীক। যিশু খ্রিস্টের জন্মদিন মানুষকে একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর শিক্ষা দেয়। অথচ সীমান্তে যখন হিংসা, অস্ত্র আর রাজনৈতিক টানাপোড়েনের খবর আসে, তখন সেই বার্তাই প্রশ্নের মুখে পড়ে। কেক কাটার মুহূর্তে অনেকেই ভাবেন—যে শান্তির কথা আমরা চার্চে প্রার্থনায় বলছি, তা কি সত্যিই চারদিকে পৌঁছচ্ছে?নিরাপত্তা বাহিনীর জওয়ানদের ভূমিকা এই সময়ে বিশেষভাবে স্মরণীয়। উৎসব মানেই যখন ছুটি আর পরিবার, তখন তাঁদের অনেকেই সীমান্তে দাঁড়িয়ে দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছেন। তাঁদের জন্য বড়দিন মানে কেবল দায়িত্ব পালনের আরেকটি দিন। পরিবার থেকে দূরে থেকে তাঁরা জানেন, সীমান্তে সামান্য শৈথিল্য মানেই বড় বিপদ। তাঁদের এই ত্যাগের কারণেই শহরের মানুষ তুলনামূলক নিরাপদে উৎসব পালন করতে পারেন।সামাজিকভাবেও এই বৈপরীত্য আমাদের ভাবায়। একদিকে উৎসবের অতিরিক্ত ভোগ, আলোকসজ্জা ও সামাজিক মাধ্যমে আনন্দের প্রদর্শন; অন্যদিকে সীমান্তবর্তী গ্রামগুলিতে আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা আর নিরাপত্তার অভাব। এই দুই বাস্তবতার ফারাক আমাদের মনে করিয়ে দেয়—উৎসবের আসল মানে কেবল আনন্দে মেতে ওঠা নয়, বরং চারপাশের কষ্ট ও সংকটকে উপলব্ধি করা।বড়দিনের কেকের মিষ্টতা আর সীমান্তের বারুদের গন্ধ—এই দুই বিপরীত চিত্র একসঙ্গে দাঁড়িয়ে আমাদের সময়ের গল্প বলে। আনন্দের মাঝেও দায়িত্ববোধ, প্রার্থনার সঙ্গে সচেতনতা—এই সমন্বয়ই হয়তো এবছরের বড়দিনের প্রকৃত শিক্ষা। শান্তির কামনায় কেক কাটার পাশাপাশি সীমান্তে শান্তি ফেরার প্রার্থনাই হোক আমাদের বড়দিনের সবচেয়ে বড় বার্তা।
