
সোমদত্তা রায়
বঙ্গ রাজনীতিতে বর্তমানে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। একদিকে যখন রাজ্যের শাসকদলের বিরুদ্ধে দুর্নীতির প্রশ্নে সুর চড়াচ্ছে গেরুয়া শিবির, ঠিক তখনই দলের অন্দরের ফাটল জনসমক্ষে চলে আসছে। সৌজন্যে— তমলুকের সাংসদ অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের বিস্ফোরক মন্তব্য। প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষের প্রশংসা করতে গিয়ে তিনি যেভাবে বঙ্গ বিজেপির বর্তমান নেতৃত্বের ‘খামতি’ আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন, তাতে অস্বস্তি যে কয়েক গুণ বেড়েছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
২০১৫ থেকে ২০২১— এই সময়কাল ছিল বঙ্গ বিজেপির স্বর্ণযুগ। দিলীপ ঘোষের সভাপতিত্বে দল যে লড়াকু মেজাজ পেয়েছিল, তার ফসল ঘরে উঠেছিল ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে। ১৮ জন সাংসদ জেতানো দিলীপ ঘোষের সেই সাফল্য আজ ইতিহাসের পাতায় ধুলো জমছে। আজ তিনি ব্রাত্য। আর এই ‘ব্রাত্য’ করে রাখার বিষয়টিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংঘের (RSS) আদর্শে দীক্ষিত একজন নিষ্ঠাবান নেতা, যিনি নিজের রক্ত-ঘাম দিয়ে সংগঠনকে জিরো থেকে হিরো করেছেন, তাঁকে কেন আজ দলীয় কর্মসূচিতে ডাকা হচ্ছে না?
প্রাক্তন বিচারপতি ও বর্তমান সাংসদ অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, “দিলীপ ঘোষের মধ্যে আগুন আছে।” তিনি মানছেন যে, দিলীপ ঘোষ সামনে না থাকলে প্রচারে ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। মজার বিষয় হলো, শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে অভিজিৎবাবুর ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক থাকলেও, তিনি দিলীপ ঘোষের পক্ষে সওয়াল করে কার্যত দলীয় অনুশাসন বা অলিখিত ‘ক্যাম্প পলিটিক্স’-এর উর্ধ্বে উঠে কথা বলেছেন। এমনকি দিলীপ ঘোষের বিয়ে নিয়ে বিতর্কেও তিনি যেভাবে পাশে দাঁড়িয়েছেন, তা রাজনৈতিক মহলে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ।
দিলীপ ঘোষকে সাইডলাইনে সরিয়ে দেওয়ার পেছনে মূলত তিনটি কারণ স্পষ্ট হয়ে উঠছে:
শুভেন্দু অধিকারীর মতো দাপুটে নেতার আগমনের পর বঙ্গ বিজেপির রাশ কার হাতে থাকবে, তা নিয়ে ক্ষমতার অলিখিত লড়াই শুরু হয়েছিল।
দলের একাংশের মতে, দিল্লি থেকে আসা পর্যবেক্ষকদের মন জুগিয়ে চলতে না পারাটাও দিলীপ ঘোষের জন্য কাল হয়েছে।তাঁর সরাসরি ও বিতর্কিত মন্তব্য অনেক সময় দলকে অস্বস্তিতে ফেললেও, সাধারণ কর্মীদের কাছে সেটাই ছিল তাঁর বড় আকর্ষণ। বর্তমান নেতৃত্ব সম্ভবত সেই ‘রাফ অ্যান্ড টাফ’ ভাবমূর্তির চেয়ে ড্রইংরুম পলিটিক্সকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
দিলীপ ঘোষকে ব্রাত্য করে রেখে বিজেপি কি আদতে নিজেদেরই ক্ষতি করছে না? ২০১৯-এর সেই ১৮টি আসনের সাফল্য আজ ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাচ্ছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের মন্তব্য সেই সত্যটিকেই আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। একজন নেতার ব্যক্তিগত জীবন বা তাঁর স্টাইল নিয়ে দ্বিমত থাকতে পারে, কিন্তু তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা এবং ‘আগুনে’ মেজাজকে অবহেলা করলে আখেরে দলেরই যে সাংগঠনিক রক্তক্ষরণ হবে, তা বলাই বাহুল্য। বঙ্গ বিজেপির উচিত নিজেদের ইগো বিসর্জন দিয়ে অভিজ্ঞ ও লড়াকু নেতাদের যথাযোগ্য সম্মান ফিরিয়ে দেওয়া, নয়তো আসন্ন নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।।
