
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক রঙ্গমঞ্চ এখন থেকেই উত্তপ্ত। সম্প্রতি তৃণমূলের প্রাক্তন বিধায়ক তথা ‘জনতা উন্নয়ন পার্টি’-র প্রতিষ্ঠাতা হুমায়ুন কবীরের আক্রমণাত্মক অবস্থান এবং সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে লক্ষ্য করে ছোড়া ‘চপ-মুড়ি-ঘুগনি’ খোঁচা রাজ্যের রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। একদিকে হুমায়ুন যখন ‘মিরাকল রেজাল্ট’-এর স্বপ্ন দেখছেন, অন্যদিকে বিরোধী শিবিরের একাংশ একে দেখছেন শাসকদলের ভোট কাটাকাটির এক সুপরিকল্পিত ‘ডামি গেম’ হিসেবে। এই টানাপোড়েনের মাঝে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন ওঠে—বাংলার ভবিষ্যৎ কি সত্যিই কোনো অলৌকিক পরিবর্তনের পথে, নাকি এটি নিছকই সুচারু এক রাজনৈতিক চাল?
হুমায়ুন কবীর যখন প্রশ্ন তোলেন, “মুখ্যমন্ত্রী কেন নিজের পরিবারকে দিয়ে চপ-ঘুগনির দোকান করান না?”, তখন তা কেবল এক ব্যক্তিগত আক্রমণ থাকে না, বরং তা রাজ্যের বেকারত্ব সমস্যার এক করুণ প্রতিধ্বনি হয়ে দাঁড়ায়। উচ্চশিক্ষিত যুবসমাজ যখন নিয়োগ দুর্নীতির কবলে পড়ে রাস্তায় বসে আছে, তখন প্রশাসনিক প্রধানের মুখে ‘চপ-মুড়ি’ বিক্রির নিদান দেওয়াকে অনেকেই উপহাস বা সংবেদনহীনতা হিসেবে দেখছেন। হুমায়ুনের এই আক্রমণ সরাসরি সেই শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ও যুবক শ্রেণির ক্ষোভকে উসকে দিচ্ছে, যার প্রতিটি পর্যায় নিয়োগ প্রক্রিয়ার দুর্নীতি জড়িয়ে আছে। তাঁর আরও বক্তব্য যে ২৫ হাজার ৭৫২ জনের চাকরি গিয়েছে, তাঁদের কী অবস্থা! প্রত্যেকটা জায়গা দুর্নীতিতে ছেয়ে গিয়েছে। দুর্নীতিমুক্ত বাংলায় নতুন সরকার আনতে সর্বস্ব দিয়ে লড়ব।”
হুমায়ুন কবীর ১৮২টি আসনে লড়ার যে ঘোষণা করেছেন, তার মেরুদণ্ড হলো ISF এবং মিম (MIM)-এর সঙ্গে সম্ভাব্য জোট। বাংলায় মুসলিম ভোটব্যাঙ্ক বরাবরই তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটি। হুমায়ুন যদি পীরজাদা আব্বাস সিদ্দিকী বা আসাদউদ্দিন ওয়েইসির সঙ্গে হাত মেলাতে সফল হন, তবে তা শাসকদলের ভোটব্যাঙ্কে বড় ধরণের ফাটল ধরাতে পারে।
তবে এখানেই উঠছে ‘ডামি পার্টি’ তত্ত্ব। বিজেপি নেতা তরুণজ্যোতি তিওয়ারির দাবি অনুযায়ী, এটি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি কৌশল হতে পারে যাতে বিরোধী ভোট ভাগ হয়ে বিজেপির যাত্রা কঠিন হয়। অতীতে শুভেন্দু অধিকারীর দলত্যাগ নিয়েও এমন সংশয় ছিল, যা পরবর্তীকালে ভুল প্রমাণিত হয়েছে। তাই হুমায়ুন কবীর সত্যিই তৃণমূলের পতন ঘটাতে চাইছেন নাকি পরোক্ষ সাহায্য করছেন, তা সময়সাপেক্ষ।
বাংলার রাজনীতি আজ এক জটিল সন্ধিক্ষণে। একদিকে দুর্নীতির অভিযোগ আর অন্যদিকে উন্নয়নের বিকল্প দিশাহীনতা। হুমায়ুন কবীরের মতো নেতারা যখন শাসকদলের পক্ষে ছিলেন তখন একরকম তথ্য পরিবেশন করেছিলেন মানুষকে আজ আবার সেই নেতাই সেই দল থেকে বেরিয়ে এসে শাসকদলের অস্বস্তিকর জায়গাগুলোতে আঘাত করেন, তখন তা সাধারণ মানুষের মনে কতটা আশার আলো সঞ্চার করে সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।আসলে বিরোধিতার বিশ্বস্ততা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। ২০২৬ সালের রায় কেবল সরকার গঠনের হবে না, তা হবে বাংলার মানুষের রাজনৈতিক সচেতনতার এক চূড়ান্ত পরীক্ষা। হুমায়ুন কবীরের ‘মিরাকল’ ঘটবে কি না, তা নির্ভর করবে বাংলার জনগণ তাকে প্রকৃত বিরোধী হিসেবে গ্রহণ করবে নাকি শাসকদলের সাজানো ‘ভোট কাটকুটি’র খেলোয়াড় হিসেবে বর্জন করবে, তার ওপরই নির্ভরশীল।।
