
শীতের রুক্ষতা কেবল প্রকৃতিতে নয়, আমাদের ত্বকে ও চুলেও স্পষ্ট ছাপ ফেলে। আর্দ্রতাহীন বাতাস আর ধুলোবালির প্রভাবে চুল হয়ে পড়ে প্রাণহীন ও নিষ্প্রাণ। এই সমস্যার সমাধানে হালে এক নতুন ঘরোয়া উপায়ের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে—চুলের পরিচর্যায় ‘বিয়ার’ (Beer) ব্যবহার। বলা হচ্ছে, শ্যাম্পুর বদলে বিয়ার ব্যবহারেই ফিরবে হারানো জেল্লা। কিন্তু রূপচর্চার এই দাওয়াই কতটা নিরাপদ আর কতটা বিজ্ঞানসম্মত? বিশেষ করে ডার্মাটোলজিক্যাল সোসাইটিগুলোর গবেষণার নিরিখে বিষয়টি বিশ্লেষণ করা অত্যন্ত জরুরি।
তাত্ত্বিকভাবে বিয়ারে থাকা মাল্ট এবং হপস (Hops) প্রোটিন সমৃদ্ধ। দাবি করা হয়, এই প্রোটিন চুলের ক্ষতিগ্রস্ত কিউটিকেল মেরামত করে এবং বিয়ারে বিদ্যমান ভিটামিন বি, জিঙ্ক ও ম্যাগনেসিয়াম চুলের গোড়া শক্ত করে। বিয়ারে থাকা শর্করা বা সুগার কিউটিকেলগুলোকে টানটান করে রাখে, যার ফলে চুল সাময়িকভাবে চকচকে দেখায়।
ডার্মাটোলজিক্যাল রিসার্চের ভিন্ন সুর
তবে বিভিন্ন দেশের ডার্মাটোলজিক্যাল সোসাইটি এবং ট্রাইকোলজিস্টদের (Trichologists) মতে, চুলের যত্নে বিয়ারের কার্যকারিতা নিয়ে এখনও কোনো শক্তিশালী ক্লিনিক্যাল প্রমাণ পাওয়া যায়নি। আমেরিকান একাডেমি অফ ডার্মাটোলজি (AAD) এবং বিভিন্ন ডার্মাটোলজিক্যাল রিসার্চ জার্নালের তথ্য অনুযায়ী, বিয়ারে থাকা প্রোটিনের অণুগুলো চুলের কিউটিকেলে প্রবেশ করার জন্য অনেক বড়। ফলে এটি চুলের ওপরে একটি সাময়িক আস্তরণ তৈরি করে জেল্লা বাড়ালেও, একে দীর্ঘস্থায়ী পুষ্টি বা ফলিকলের গভীরের যত্ন বলা চলে না।
সবথেকে বড় আশঙ্কার জায়গা হলো বিয়ারে থাকা অ্যালকোহল। ডার্মাটোলজিক্যাল সোসাইটিগুলোর মতে, অ্যালকোহল একটি শক্তিশালী ‘ডিহাইড্রেটিং এজেন্ট’ বা শুষ্ককারী উপাদান। শীতকালে এমনিতেই বাতাসে আর্দ্রতা কম থাকে, তার ওপর সরাসরি অ্যালকোহলযুক্ত বিয়ার চুলে ব্যবহার করলে তা চুলের প্রাকৃতিক তেল বা সিবাম (Sebum) পুরোপুরি শুষে নেয়। এটি চুলকে সাময়িকভাবে উজ্জ্বল করলেও দীর্ঘমেয়াদে তা চুলকে আরও বেশি ভঙ্গুর ও খসখসে করে তোলে।
যদি কেউ শখের বশে বিয়ার ব্যবহার করতে চান, তবে ডার্মাটোলজিক্যাল বিশেষজ্ঞদের কিছু সতর্কবার্তা মেনে চলা উচিত:
বিয়ারের কার্বন ডাই-অক্সাইড জলের সঙ্গে মিশলে মৃদু কার্বোনিক অ্যাসিড তৈরি করে যা চুলের প্রাকৃতিক অম্লতা বা pH ভারসাম্যের ক্ষতি করতে পারে। তাই ব্যবহারের আগে বোতল খুলে দীর্ঘক্ষণ রেখে ‘ডি-কার্বোনেটেড’ করা জরুরি।অ্যালকোহলের শুষ্কতা কমাতে এর সাথে জল বা শ্যাম্পু মিশিয়ে ব্যবহার করা ভালো।
আধুনিক ডার্মাটোলজি বিয়ারের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর এবং বৈজ্ঞানিক উপায় হিসেবে চুলের pH ব্যালেন্স বজায় রাখা কন্ডিশনার বা হাইড্রেটিং হেয়ার মাস্ক ব্যবহারের পরামর্শ দেয়। বিয়ার ব্যবহার কেবল একটি চটকদার ‘বিউটি হ্যাক’ হিসেবে চমৎকার হলেও তা কোনো স্থায়ী চিকিৎসা নয়। বিশেষ করে যাঁদের স্ক্যাল্প সংবেদনশীল বা যাদের চর্মরোগের প্রবণতা আছে, তাঁদের ক্ষেত্রে বিয়ারের অ্যালকোহল স্ক্যাল্পে জ্বালা বা অ্যালার্জি সৃষ্টি করতে পারে। শীতের এই শুষ্কতায় চুলের প্রকৃত জেল্লা বজায় রাখতে রাসায়নিক নিরীক্ষার চেয়ে সঠিক খাদ্যাভ্যাস এবং পরিমিত আর্দ্রতা বজায় রাখাই অধিক শ্রেয়।।
