
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দুই প্রতিবেশী দেশ থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার সীমান্ত সংঘাতের বলি হলেন খোদ হিন্দু দেবতা বিষ্ণু। কম্বোডিয়া সীমান্তে অবস্থিত ৩২৮ ফুট উচ্চতার একটি বিশালাকায় বিষ্ণুমূর্তি থাইল্যান্ডের সেনাবাহিনী বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ায় বিশ্বজুড়ে হিন্দুদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে ভারতের নেটজনতারা এই ঘটনার প্রতিবাদে সরব হয়েছেন এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রেন্ড করছে ‘বয়কট থাইল্যান্ড’।
দীর্ঘদিন ধরেই থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার মধ্যে সীমান্ত বিতর্ক চলছে। চলতি বছরের জুলাই মাস থেকে শুরু হওয়া ভয়াবহ লড়াইয়ে দু’পক্ষের অন্তত ৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে। যদিও আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় মাঝে শান্তিচুক্তির কথা উঠেছিল, কিন্তু ডিসেম্বরে পরিস্থিতি ফের অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে। ২০১৪ সালে কম্বোডিয়া সীমান্তে স্থাপিত এই বিষ্ণুমূর্তিটি ছিল দুই দেশের ঐতিহ্যের স্মারক। কিন্তু নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে থাইল্যান্ডের সেনা মূর্তিটি ধ্বংস করায় ক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে পড়েছে।
ভারত সরকারের বিদেশমন্ত্রক ইতিমধ্যেই এই ঘটনাকে ‘হিন্দুদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত’ বলে অভিহিত করে কড়া বিবৃতি দিয়েছে। কিন্তু নেটিজেনরা আরও একধাপ এগিয়ে থাইল্যান্ডকে অর্থনৈতিক শিক্ষা দেওয়ার ডাক দিয়েছেন। একজন নেটিজেন লিখেছেন “পাটায়ার সমস্ত বুকিং বাতিল করে থাইল্যান্ডকে এমন শিক্ষা দিন যাতে ওরা নতজানু হয়ে ক্ষমা ভিক্ষা করে।” * অন্য একজন লিখেছেন, “কম্বোডিয়া যেখানে তাদের প্রাচীন মন্দিরের মাধ্যমে হিন্দুধর্মকে সম্মান জানাচ্ছে, সেখানে থাইল্যান্ডের এই নিষ্ঠুরতা মেনে নেওয়া যায় না।”
ভারতীয় পর্যটকদের কাছে থাইল্যান্ড অত্যন্ত জনপ্রিয় গন্তব্য। প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ ভারতীয় সেখানে বেড়াতে যান, যা থাইল্যান্ডের জিডিপিতে বড় অবদান রাখে। মালদ্বীপের সাম্প্রতিক ঘটনার মতোই যদি ভারতীয় পর্যটকরা মুখ ফিরিয়ে নেন, তবে থাইল্যান্ডের পর্যটন শিল্প বড়সড় ধাক্কা খাবে— এই সিঁদুরে মেঘ দেখছে ব্যাংকক প্রশাসন।
পরিস্থিতি হাতের বাইরে যাচ্ছে দেখে থাইল্যান্ড সরকার তড়িঘড়ি সাফাই দিয়েছে। তাদের দাবি, ওই স্থানটি কোনো স্বীকৃত উপাসনালয় ছিল না এবং সীমান্ত নিরাপত্তার স্বার্থেই এই কঠিন পদক্ষেপ নিতে হয়েছে। কোনো নির্দিষ্ট ধর্মকে আঘাত করা তাদের উদ্দেশ্য ছিল না। তবে এই বয়ানকে খুব একটা গুরুত্ব দিচ্ছে না ভারতের বিদেশমন্ত্রক। ভারতের তরফে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, যুদ্ধ চললেও যেন প্রাচীন স্থাপত্য ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের ক্ষতি না করা হয়।
ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত কি মেনে নেওয়া যায়?প্রশ্ন উঠছে, কেন বারবার রাজনৈতিক বা সীমান্ত সংঘাতের মাঝখানে ধর্মীয় অনুভুতিকে টেনে আনা হবে? কম্বোডিয়া যেখানে হিন্দু ঐতিহ্যের ধারক হিসেবে নিজেকে তুলে ধরছে, সেখানে থাইল্যান্ডের এই ‘বুলডোজার নীতি’ কেবল একটি মূর্তিকে নয়, বরং লক্ষ লক্ষ মানুষের বিশ্বাসকে চূর্ণ করেছে। আধুনিক বিশ্বে পর্যটন কেবল ঘোরাফেরা নয়, এটি দুই দেশের সংস্কৃতি ও সম্মানের আদান-প্রদান। থাইল্যান্ড যদি এই ভুলের জন্য নিঃশর্ত ক্ষমা না চায় এবং যথাযথ সংস্কারের পথে না হাঁটে, তবে ভারতীয় পর্যটকদের এই ক্ষোভের আগুন প্রশমিত হওয়া কঠিন।
