
২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচন এখনও মাসখানেক দূরে, কিন্তু বাংলার রাজনীতির রঙ্গমঞ্চ এখনই সরগরম। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাম্প্রতিক বাকযুদ্ধ প্রমাণ করে দিচ্ছে যে, উন্নয়নের চেয়েও একে অপরকে রাজনৈতিকভাবে বিদ্ধ করাই এখন প্রধান লক্ষ্য। এই পুরো পরিস্থিতিকে যদি একটি নাটকের সঙ্গে তুলনা করা হয়, তবে দেখা যাবে চিত্রনাট্যটি বেশ পুরনো—একদিকে ‘অনুপ্রবেশ’ ও ‘জাতীয় নিরাপত্তা’, অন্যদিকে ‘রাজ্যের অধিকার’ ও ‘কেন্দ্রীয় বঞ্চনা’।
কলকাতার সাংবাদিক বৈঠক থেকে অমিত শাহ যখন অনুপ্রবেশ ইস্যুকে হাতিয়ার করে রাজ্য সরকারকে বিঁধছেন, তখন তাঁর তূণে ছিল ‘নিরাপত্তা’র বাণ। তাঁর দাবি, রাজ্য সরকার জমি দিচ্ছে না বলেই সীমান্তের কাঁটাতার বসানো যাচ্ছে না। শাহের এই আক্রমণ আসলে এক বিশেষ ভোটার গোষ্ঠীকে বার্তা দেওয়ার চেষ্টা। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, রাজ্যে বিজেপি সরকার না এলে এই ‘অনুপ্রবেশ’ বন্ধ হবে না।
ঠিক তার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বাঁকুড়ার বড়জোড়া থেকে পাল্টা গর্জে উঠলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি শুধু জমি দেওয়ার খতিয়ানই পেশ করলেন না, বরং নাম না করে শাহকে ‘দুর্যোধন-দুঃশাসন’ বলে কটাক্ষ করলেন। তাঁর পাল্টা প্রশ্ন—অনুপ্রবেশ যদি কেবল বাংলাতেই হয়, তবে কাশ্মীরের পহেলগাঁও বা দিল্লির বিস্ফোরণ কেন রুখতে পারছে না কেন্দ্র? মমতার এই আক্রমণ আসলে রক্ষণাত্মক নয়, বরং পাল্টা আক্রমণাত্মক। তিনি বোঝাতে চাইলেন, সীমান্ত রক্ষার দায়িত্ব বিএসএফ তথা কেন্দ্রীয় সরকারের, সেখানে ব্যর্থতা ঢাকতেই রাজ্যের ওপর দায় চাপানো হচ্ছে।
এই বাকযুদ্ধ বা অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের আড়ালে আসল সত্যটা হলো—এটি একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক নাটক। নেতা-মন্ত্রীরা এখানে কুশীলব, যারা নিজেদের ভোটের ঝুলি পূর্ণ করতে সংঘাতের চড়া সুর বেঁধে দিচ্ছেন। রাজ্য বলছে জমি দেওয়া হয়েছে, কেন্দ্র বলছে হয়নি। মাঝখানে পড়ে থমকে থাকে সীমান্ত সুরক্ষা। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা এখানে রাজনীতির দাবার ঘুঁটি। দোষারোপের খেলায় আসল সমাধান ঢাকা পড়ে যায়।
এই নাটকের নীরব দর্শক হলেন বাংলার সাধারণ মানুষ। মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব বা কর্মসংস্থানের মতো জ্বলন্ত ইস্যুগুলো যখন এই অনুপ্রবেশ আর জমি বিতর্কের তলায় চাপা পড়ে যায়, তখন মানুষ ঠিকই বুঝতে পারে কারা তাঁদের আবেগ নিয়ে খেলছে।
নেতারা হয়তো ভাবছেন মানুষ বোকা, কিন্তু বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস বলছে ভিন্ন কথা। ২০২৬-এর নির্বাচনে ব্যালট বক্স বা ইভিএমই হবে সেই আদালত, যেখানে এই নাটকের কুশীলবদের বিচার হবে। মানুষ আজ অনেক বেশি সচেতন; তাঁরা জানেন কখন হাততালি দিতে হয় আর কখন যবনিকা টেনে দিতে হয়। শাহ-মমতার এই তর্জা শেষ পর্যন্ত ভোটবাক্সে কী প্রভাব ফেলে, সেটাই এখন দেখার। তবে একটা বিষয় নিশ্চিত—মানুষ আর কেবল ‘দর্শক’ হয়ে থাকতে রাজি নয়, তারা এখন উত্তরের অপেক্ষায়।।
