
পৌষের হাড়কাঁপানো ঠান্ডা, কুয়াশাভেজা শান্তিনিকেতনের ছাতিমতলা আর বাউল গানের সুর— বাঙালির শীতকালীন আবেগের ককটেল মানেই পৌষমেলা। কিন্তু এবারের মেলায় কেবল নলেন গুড় আর পিঠেপুলির গন্ধ নয়, বরং বেশি করে নাকে লাগল ‘স্পিরিট’-এর ঝাঁজ! হিসেব বলছে, গত ২৩ থেকে ২৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত মাত্র ৬ দিনে বোলপুর-শান্তিনিকেতনে রেকর্ড পরিমাণ মদ বিক্রি হয়েছে। আবগারি দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, শান্তিনিকেতনের ৪৪টি দোকান থেকে মানুষ গলায় ঢেলেছেন প্রায় ২ কোটি ৪৯ লক্ষ ৯৬ হাজার ৪১১ টাকার সুরা!
শান্তিনিকেতন ট্রাস্ট ও বিশ্বভারতীর উদ্যোগে এবছর মেলা বসেছিল পূর্বপল্লির মাঠে। পর্যটকদের ভিড় যেমন ছিল চোখে পড়ার মতো, তেমনই দোকানের ক্যাশ কাউন্টারেও বেজেছে লক্ষ্মীর ঝাঁপি। আবগারি দপ্তরের দেওয়া পরিসংখ্যান অবাক করার মতো:
- দেশি মদ: ৯৮ লক্ষ ৬৩ হাজার ২৪০ টাকা
- বিলিতি মদ: ১ কোটি ২৫ লক্ষ ২৫ হাজার ৭৪০ টাকা
- বিয়ার: ২৬ লক্ষ ৭ হাজার ৪৩০ টাকা
ব্যবসায়ীদের কথায়, “শীতের কামড় যত বেড়েছে, গ্লাসের টান তত ঘন হয়েছে।” সব মিলিয়ে প্রায় আড়াই কোটির এই কারবারে বিক্রেতাদের মুখে এখন চওড়া হাসি।
১৮৪৩ সালে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষিত হওয়ার দিনটিকে কেন্দ্র করেই এই উৎসবের সূচনা। ১৮৯৪ সাল থেকে শান্তিনিকেতনের মাঠে শুরু হওয়া এই মেলা আসলে ছিল শিল্প, সংস্কৃতি আর আধ্যাত্মিকতার মিলনস্থল। এবারের মেলায় ‘বিশ্বে বিশ্বকবি’ শীর্ষক আলোকচিত্র প্রদর্শনী বা কলাভবনের কাজ পর্যটকদের মুগ্ধ করেছে ঠিকই, কিন্তু উৎসবের সমান্তরালে মদের এই বিপুল চাহিদা এক অন্য বাস্তবকে সামনে এনেছে।
এখন প্রশ্ন উঠছে, বাঙালির শীতের আমেজ কি এখন শুধুই ‘মদ-নির্ভর’? আগে শীতকাল মানে ছিল চড়ুইভাতি, ব্যাডমিন্টন আর চাদর মুড়ি দিয়ে আড্ডা। এখন সেই আড্ডার মধ্যমণি হয়ে দাঁড়িয়েছে সুরা। পিকনিক হোক বা পৌষমেলা— সুরাহীন আনন্দ যেন অনেকের কাছেই এখন ‘ফিকে’। একসময়ের তপোবন-ধন্য শান্তিনিকেতনে আড়াই কোটির মদ বিক্রি সেই বদলানো সংস্কৃতিরই বড় প্রমাণ।
শীত আসুক বা বর্ষা, উৎসব আসুক বা পরব— আধুনিক জীবনযাত্রায় ‘মদই ভরসা’ হয়ে দাঁড়াচ্ছে অনেকের কাছে। যে শান্তিনিকেতন রবি ঠাকুরের দর্শন আর ত্যাগের আদর্শে গড়া, সেখানে ছ’দিনে আড়াই কোটির মদ বিক্রি হওয়াটা নিছক বাণিজ্যিক সাফল্য নাকি সামাজিক অবক্ষয়, সেই তর্ক চলতেই থাকবে। তবে আপাতত, কনকনে ঠান্ডায় মদের গ্লাসে চুমুক দিয়েই শান্তিনিকেতনের ‘পৌষ’ কাটল হাজার হাজার মানুষের।।
