
রাজনীতিতে একটা কথা খুব প্রচলিত—যাঁকে আপনি মাঠের বাইরে পাঠাতে চাইছেন, তিনি যদি খোদ ‘ক্যাপ্টেনের’ নির্দেশে আবার ব্যাটিং করতে নামেন, তবে প্রতিপক্ষ তো বটেই, নিজের ড্রেসিংরুমের অনেকেরই অস্বস্তি বেড়ে যায়। বঙ্গ বিজেপির ‘দাবাং’ নেতা দিলীপ ঘোষের ক্ষেত্রেও ঠিক সেটাই ঘটছে। দীর্ঘ প্রায় আট মাসের একপ্রকার ‘বনবাস’ বা রাজনৈতিক নিস্পৃহতা কাটিয়ে তিনি যখন সল্টলেকের দলীয় কার্যালয়ে ঢুকলেন, তখন তাঁর শরীরী ভাষায় সেই পুরনো দাপট স্পষ্ট। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সঙ্গে বৈঠকের পর তাঁর এই সক্রিয়তা স্রেফ প্রত্যাবর্তন নয়, বরং ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনের আগে এক বড়সড় রাজনৈতিক মোড়।
দিলীপ ঘোষ মানেই চাঁচাছোলা কথা আর মেঠো রাজনীতির মেজাজ। বৃহস্পতিবার তিনি যখন বললেন, “অমিত শাহ মাঠে নামতে বলেছিলেন, আমি নেমে পড়েছি,” তখন আর বুঝতে বাকি থাকে না যে দিল্লির সবুজ সংকেত তাঁর পকেটে। কিন্তু এই প্রত্যাবর্তনের দিনেও তিনি যেটা সবচেয়ে বেশি স্পষ্ট করে দিলেন, তা হলো দলের অন্দরের ফাটল। নাম না করে শুভেন্দু অধিকারীর দিকে তিনি যে তির ছুড়লেন, তা বঙ্গ রাজনীতির অন্দরমহলে বড় আলোড়ন তৈরি করেছে। নিজেকে ঘিরে হওয়া বিক্ষোভের প্রসঙ্গে তিনি সোজাসুজি আঙুল তুললেন ‘তৃণমূল থেকে আসা’ নেতাদের দিকে। তাঁর দাবি, বিজেপির আদি সংস্কৃতিতে কালো পতাকা দেখানোর রেওয়াজ নেই। এই একটি মন্তব্যে তিনি শুধু শুভেন্দু অনুগামীদের নিশানা করলেন না, বরং আবার সেই ‘আদি বনাম নব্য’ লড়াইয়ের বিতর্ক উস্কে দিলেন।
২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে হারের পর দিলীপ ঘোষের ডানা ছাঁটা হয়েছিল বলে মনে করছিল রাজনৈতিক মহলের একাংশ। এমনকি দলের একাংশের বিক্ষোভের মুখেও তাঁকে পড়তে হয়েছে। কিন্তু দিলীপ এদিন বুঝিয়ে দিলেন, তিনি লড়াইয়ের ময়দান ছাড়ছেন না। এমনকি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘ আন্দোলনের ইতিহাস টেনে তিনি দলীয় কর্মীদের বার্তা দিলেন—ক্ষমতায় আসতে হলে ধৈর্যের সঙ্গে লড়াই করতে হয়। তাঁর এই মন্তব্য আসলে বর্তমান রাজ্য নেতৃত্বের একাংশের প্রতি এক প্রচ্ছন্ন খোঁচা, যারা লড়াইয়ের চেয়ে অনেক সময় ‘গটআপ গেম’ বা সোশ্যাল মিডিয়া রাজনীতিতে বেশি অভ্যস্ত বলে অভিযোগ ওঠে।
প্রশ্ন উঠছে, দিলীপ ঘোষের এই সক্রিয়তা কি ২০২৬ সালে বিজেপির পায়ের তলার জমি শক্ত করবে? নাকি এই অভ্যন্তরীণ সংঘাত দলকে আরও দুর্বল করে দেবে? একদিকে শুভেন্দু অধিকারীর সংসদীয় কৌশল আর অন্যদিকে দিলীপ ঘোষের জনভিত্তি ও সাংগঠনিক দক্ষতা—এই দুইয়ের মেলবন্ধন ঘটালে বিজেপির লাভ। কিন্তু বাস্তবে এই দুই মেরুর দ্বন্দ্ব বারংবার প্রকাশ্যে চলে আসছে। অমিত শাহের ‘ভোকাল টনিকে’ দিলীপ চাঙ্গা হলেও, বঙ্গ বিজেপির এই গৃহযুদ্ধ সামলানোই এখন দিল্লির কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। দিলীপ ঘোষ ময়দানে নেমে পড়েছেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর এই ‘সেকেন্ড ইনিংস’ শেষ পর্যন্ত দলের জয় আনবে নাকি অন্তর্দ্বন্দ্বের নতুন খতিয়ান তৈরি করবে, তা সময়ই বলবে।।
