
নতুন বছরের শুরুতেই দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে নতুন উত্তাপ ছড়িয়েছে। বালোচ নেতা মির ইয়ার বালোচ ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের কাছে একটি খোলা চিঠি লিখে সতর্ক করেছেন যে, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে পাকিস্তান-শাসিত বালোচিস্তানে সরাসরি চিনা সেনা মোতায়েন হতে পারে। ১ জানুয়ারি ২০২৬-এ পাঠানো এই চিঠিতে তিনি দাবি করেছেন, এই পদক্ষেপ শুধু বালোচ জনগণের জন্য নয়, ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও এক ‘অকল্পনীয় হুমকি’ হয়ে দাঁড়াবে।
মির ইয়ার বালোচের মতে, চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (CPEC) এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। এই প্রকল্পের সুরক্ষা নিশ্চিত করার অজুহাতে চিন সেখানে বড় আকারের সামরিক উপস্থিতি বাড়াতে চায়। চিঠিতে বলা হয়েছে, যদি বালোচ স্বাধীনতা শক্তিকে এখনই শক্তিশালী না করা হয় এবং এই অঞ্চলে আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ না ঘটে, তবে চিনা সামরিক বাহিনীর অবস্থান ভারতের পশ্চিম সীমান্তে এক স্থায়ী বিপদ তৈরি করবে।
চিঠিতে ভারতের সাম্প্রতিক ‘অপারেশন সিনদুর’-এর প্রশংসা করে বলা হয়েছে, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ভারতের এই দৃঢ় অবস্থান বালোচ জনগণের মনে আশা জাগিয়েছে। এছাড়া, হিংলাজ মাতা মন্দিরের মতো সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক যোগসূত্রগুলো তুলে ধরে বালোচ নেতা ভারত ও বালোচিস্তানের মধ্যে গভীর কৌশলগত সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছেন।
এই চিঠির প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সমীকরণ সামনে আসে:
- চিন-পাক অক্ষ: পাকিস্তান বর্তমানে চরম অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত। বালোচিস্তানে নিজেদের স্বার্থ ও বিনিয়োগ রক্ষা করতে পাকিস্তান এখন চিনের ওপর আগের চেয়ে অনেক বেশি নির্ভরশীল। চিনা সেনা মোতায়েন মানে পাকিস্তানের সার্বভৌমত্বের ওপর চিনের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ।
- বালোচ প্রতিরোধ: স্থানীয় বালোচ জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরেই দাবি করে আসছে যে, উন্নয়নের নামে তাদের সম্পদ লুণ্ঠন করা হচ্ছে। চিনা সেনা মোতায়েনের আশঙ্কা তাদের এই ক্ষোভকে আরও উস্কে দিয়েছে।
- ভারতের ভূমিকা: ভারতের জন্য বালোচিস্তান কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চিনের এই সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ভারতের জন্য দ্বিমুখী চাপ (Two-front challenge) তৈরি করতে পারে। ভারত দীর্ঘদিন ধরে বালোচিস্তানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি আন্তর্জাতিক স্তরে তুলে ধরলেও, সরাসরি সামরিক বা কৌশলগত সহযোগিতার ক্ষেত্রে সর্বদা সতর্ক কূটনীতি বজায় রেখেছে।
কূটনৈতিক ভাষায় এই পরিস্থিতিকে ‘পাওয়ার গেম’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। যদি সত্যি চিন সেখানে সেনা মোতায়েন করে, তবে আরব সাগরে চিনের আধিপত্য নিরঙ্কুশ হবে, যা ভারতের সমুদ্রপথের বাণিজ্যেও প্রভাব ফেলতে পারে। মির ইয়ার বালোচের এই চিঠি মূলত ভারতকে এক সক্রিয় খেলোয়াড় হিসেবে এই সংকটে জড়িয়ে পড়ার অনুরোধ। এখন দেখার বিষয়, নয়াদিল্লি এই চিঠির বিষয়ে কতটা সরাসরি বা পরোক্ষ প্রতিক্রিয়া দেখায়।
পাকিস্তান ও চিনের এই ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা এবং বালোচদের এই আর্তনাদ দক্ষিণ এশিয়ার মানচিত্র ও নিরাপত্তার সমীকরণকে কোন দিকে নিয়ে যায়, ২০২৬ সালে সেটিই হবে বড় দেখার বিষয়।।
