
মুম্বইয়ের রাজনীতিতে রবিবার এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী থাকল দাদরের শিবসেনা ভবন। প্রায় ২০ বছর আগে যে সদর দপ্তর থেকে অভিমানে ও ক্ষোভে বেরিয়ে গিয়েছিলেন রাজ ঠাকরে, সেখানেই তাঁর রাজকীয় প্রত্যাবর্তন ঘটল। দীর্ঘ দুই দশক পর শিবসেনা ভবনে পা রেখে রাজের সেই মন্তব্য— “মনে হচ্ছে যেন জেল থেকে বেরলাম”— কেবল ব্যক্তিগত আবেগ নয়, বরং মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে এক বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত। আসন্ন বৃহন্নুম্বই পৌর কর্পোরেশন (বিএমসি) নির্বাচনকে কেন্দ্র করে উদ্ধব ঠাকরে ও রাজ ঠাকরের এই হাত মেলানো আদতে বিজেপির জন্য এক কঠিন চ্যালেঞ্জের বার্তা।
রাজ ও উদ্ধবের এই পুনর্মিলন কেবল দুই ভাইয়ের এক হওয়া নয়, এটি মূলত মারাঠি অস্মিতা বা ভূমিপুত্রদের আবেগ রক্ষার এক যৌথ লড়াই। দীর্ঘদিন ধরে শিবসেনার রাজনীতি যে মারাঠি আবেগের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে ছিল, একনাথ শিন্ডের বিদ্রোহের পর তা কিছুটা ধাক্কা খেয়েছিল। এখন এমএনএস এবং শিবসেনা (ইউবিটি) একজোট হওয়ায় সেই পুরোনো সাংগঠনিক শক্তি আবার মাথা চাড়া দিচ্ছে। রাজ ঠাকরে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, মুম্বইয়ের পরবর্তী মেয়র হবেন একজন ‘মারাঠি’। এই ঘোষণায় স্পষ্ট যে, আসন্ন নির্বাচনে উন্নয়নের পাশাপাশি মারাঠি সেন্টিমেন্টই হবে তাঁদের প্রধান অস্ত্র।
তবে বিজেপিও এই ময়দান ছেড়ে দিতে নারাজ। মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিশ ইতিমধ্যেই পাল্টা দাবি তুলেছেন যে, মেয়র হবেন তাঁদের জোট থেকেই এবং তিনি হবেন একাধারে ‘হিন্দু ও মারাঠি’। অর্থাৎ, মারাঠি ভোটব্যাংকে ভাগ বসাতে বিজেপিও এখন হিন্দুত্ব ও আঞ্চলিক আবেগের মিশেল দিতে চাইছে। ফলে লড়াইটা এখন আর কেবল উন্নয়নের নয়, কে বড় মারাঠি দরদি— তা প্রমাণের প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে।
উদ্ধব ও রাজের যৌথ ইশতেহারে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সমস্যার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। গৃহকর্মীদের জন্য মাসিক ১,৫০০ টাকার ‘স্বভিমান নিধি’ বা ছোট ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে সম্পত্তি কর মুকুবের মতো ঘোষণাগুলো সরাসরি মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত ভোটারদের স্পর্শ করবে। অন্যদিকে, বিজেপির বিরুদ্ধে ‘৮০ হাজার কোটি টাকার কেলেঙ্কারি’র যে গুরুতর অভিযোগ উদ্ধব তুলেছেন, তা রাজনৈতিক মহলে যথেষ্ট শোরগোল ফেলেছে। পরিবেশ রক্ষা এবং মুম্বইয়ের সম্পদ রক্ষার লড়াইকেও তিনি অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
সব মিলিয়ে, এই জোট শুধু দুই ভাইয়ের পুনর্মিলন নয়, বরং বিজেপির জন্য এক কঠিন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। মহারাষ্ট্রের অন্য অংশে বিজেপি শক্ত অবস্থানে থাকলেও, বিএমসি দখলের লড়াই যে সহজ হবে না, তা এখন স্পষ্ট। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ঠিক ক্রিকেট খেলার মতোই বলা যায় না লাস্ট ওভারে কি হবে। রাজনীতির ময়দানও তেমনই। মুম্বইয়ের দখল কার হাতে থাকবে, তা নিয়ে লড়াই এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। একদিকে বিজেপির সাংগঠনিক শক্তি ও ক্ষমতা, অন্যদিকে দুই ঠাকরে ভাইয়ের সম্মিলিত আবেগ ও মারাঠি অস্মিতার লড়াই। রাজ ঠাকরের শিবসেনা ভবনে ফিরে আসা যদি সাধারণ সমর্থকদের মধ্যে জোয়ার তৈরি করতে পারে, তবে মুম্বইয়ের মসনদ ধরে রাখা মহাজোটের জন্য বেশ কঠিন হবে। শেষ পর্যন্ত মুম্বইয়ের ভোটাররা কাকে বেছে নেবেন, তা সময়ই বলবে, তবে দুই ভাইয়ের এই ঐক্য যে রাজনীতির চাকা ঘুরিয়ে দিয়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।।
