
নয়ডার এক বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্টে ঘটে যাওয়া রক্তক্ষয়ী ঘটনা ফের একবার আধুনিক নগরজীবনের অন্ধকার দিকটি সামনে এনে দিল। দক্ষিণ কোরিয়ার এক নাগরিককে তাঁর লিভ-ইন সঙ্গী মণিপুরের এক তরুণী ছুরি দিয়ে কুপিয়ে খুন করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনা কেবল একটি অপরাধ নয়, বরং আমাদের বর্তমান সমাজের তলানিতে ঠেকে যাওয়া মানবিকতা এবং জটিল মনস্তাত্ত্বিক সংকটের প্রতিফলন।
পুলিশ সূত্রে খবর, মৃত যুবকের নাম ডাক হি ইউ, যিনি একটি স্বনামধন্য মোবাইল কোম্পানির শাখা ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। গত দুই বছর ধরে তিনি মণিপুরের বাসিন্দা লুঞ্জেয়ানা পামাইয়ের সঙ্গে লিভ-ইন সম্পর্কে ছিলেন। ঘটনার রাতে দুজনেই মদ্যপান করছিলেন। গভীর রাতে মত্ত অবস্থায় তাঁদের মধ্যে প্রবল অশান্তি শুরু হয়। বচসা চলাকালীন রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে লুঞ্জেয়ানা একটি ছুরি দিয়ে ডাকের বুকে সজোরে আঘাত করেন। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ফলে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথেই তাঁর মৃত্যু হয়। অভিযুক্ত তরুণীকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে এবং তিনি নিজের অপরাধ স্বীকারও করেছেন।
আজকের দিনে এই ধরণের ঘটনা প্রায়শই সংবাদ শিরোনামে উঠে আসছে। কখনো নয়ডা, কখনো দিল্লি বা বেঙ্গালুরু—লিভ-ইন সঙ্গী বা প্রিয়জনের হাতে খুন হওয়ার খবর এখন ডালভাত হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে মানুষটির সঙ্গে দিনের পর দিন ছাদের তলায় থাকা, সুখ-দুঃখ ভাগ করে নেওয়া, সেই মানুষটির বুকেই ছুরি বসাতে দ্বিধা করছে না আজকের প্রজন্ম। এর থেকে স্পষ্ট যে, সম্পর্কের গভীরতা আজ ফিকে হয়ে আসছে। মানুষের সহ্যক্ষমতা এবং মানবিকবোধ এতটাই কমে গিয়েছে যে, ক্ষণিকের রাগ জীবন কেড়ে নিতেও পিছুপা হচ্ছে না।
এই ধরণের অপরাধের পিছনে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক কারণ থাকে। মনোবিদদের মতে, নিঃসঙ্গতা, কাজের অত্যধিক চাপ এবং নেশার ওপর নির্ভরতা মানুষের মেজাজকে খিটখিটে ও হিংস্র করে তুলছে। লিভ-ইন সম্পর্কে অনেক সময় প্রতিশ্রুতির অভাব বা একে অপরের প্রতি আস্থার অভাব তৈরি হয়। যখনই মদ্যপান বা অন্য কোনো কারণে যুক্তিবোধ কাজ করা বন্ধ করে দেয়, তখনই অবদমিত ক্ষোভ অগ্ন্যুৎপাতের মতো বেরিয়ে আসে।
বড় পর্দার জুটির প্রেম দেখে যখন আমরা রঙিন স্বপ্ন বুনি, বাস্তব জীবনের এই হাড়হিম করা ঘটনাগুলো আমাদের মাটিতে আছড়ে ফেলে। লুঞ্জেয়ানা পুলিশকে জানিয়েছেন যে তিনি খুন করতে চাননি, কিন্তু রাগের মাথায় ওই কাণ্ড করে ফেলেছেন। এই ‘রাগের মাথায়’ ঘটে যাওয়া অপরাধগুলোই প্রমাণ করে যে, আমরা নিজেদের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে কতটা অক্ষম হয়ে পড়েছি।
নয়ডার এই ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যে, কেবল অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা বা বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে থাকলেই জীবন সুন্দর হয় না। সুস্থ সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন ধৈর্য, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং সবার আগে সঠিক মানসিক স্বাস্থ্য। আইনের হাতে তরুণী শাস্তি পাবেন ঠিকই, কিন্তু যে মানবিকতা সমাজ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে, তা কি আদৌ ফিরে আসবে।
আজকের সমাজ যে অবক্ষয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে তার জন্য আমাদের সমাজের আল্ট্রা আধুনিকতা অনেকাংশেই দায়ী।।
