
আজকাল ঘুম থেকে উঠে ফোনের স্ক্রিনে চোখ রাখলেই এক নিখুঁত পৃথিবীর দেখা মেলে। সেখানে সবাই সুখী, সবার সম্পর্ক মধুময়, প্রত্যেকের ডাইনিং টেবিলে সাজানো রাজকীয় খাবার, আর পর্যটন কেন্দ্রগুলো যেন একেকটি স্বর্গ। কিন্তু এই উজ্জ্বল পর্দার আড়ালে যে অন্ধকার জমাট বাঁধছে, তা আমরা কজন দেখছি? সোশ্যাল মিডিয়া আর এআই (AI) প্রযুক্তির এই যুগে আমরা এক ভয়াবহ ‘প্রদর্শনী ব্যাধিতে’ আক্রান্ত। রিল আর রিয়েল লাইফের মধ্যেকার দূরত্বটা এখন আকাশ-পাতাল।
আগেকার দিনে ভালোবাসা বা বন্ধুত্বের উৎসব ছিল একান্ত ব্যক্তিগত। পরিবারের চার দেয়ালের মধ্যে যে হাসি-কান্না ছিল, তার মূল্য ছিল অকৃত্রিম। আজ সেই আবেগ লেন্সের ফোকাসে বন্দি। কে কতটা দামি উপহার পেল বা কার ভ্যাকেশন ট্রিপ কত বেশি ‘ইনস্টাগ্রামযোগ্য’ হলো, তা দিয়েই এখন সম্পর্কের গভীরতা মাপা হয়। অথচ দরজার ওপাশে কান পাতলে অনেক সময়ই শোনা যায় ভাঙনের শব্দ। সম্প্রতি গায়িকা দেবলীনা নন্দীর ঘটনাটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, হাসিখুশি প্রোফাইল পিকচারের আড়ালে কতটা বীভৎস অত্যাচার লুকিয়ে থাকতে পারে। আমরা যখন অন্যের সাজানো জীবন দেখে নিজেদের তুচ্ছ ভাবছি, তখন হয়তো সেই মানুষটিই ভেতরে ভেতরে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছেন শুধু ‘পারফেক্ট’ সাজার চাপে। নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি তিনি অন্যদের মনেও এক মিথ্যে হীনম্মন্যতা তৈরি করছেন।
এই মেকি দুনিয়ার সবচেয়ে বড় কারিগর তথাকথিত কিছু ইনফ্লুয়েন্সার ও ভ্লগার। সাধারণ মানের একটি হোটেল বা মন্দ স্বাদের খাবারকে তারা স্রেফ ভিউ , আর্থিক মুনাফা আর স্পন্সরশিপের লোভে এমনভাবে তুলে ধরেন যে সাধারণ মানুষ প্রলুব্ধ হয়। মন্দারমণি হয়ে যায় ফুকেত, আর জঘন্য খাবার হয়ে ওঠে অমৃত। এই যে সত্যকে আড়াল করে মিথ্যেকে বিপণন করার প্রবণতা, এটা সমাজকে এক গভীর অস্তিত্ব সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। মানুষ এখন অভিজ্ঞতার চেয়ে ছবি তোলাকে বেশি গুরুত্ব দেয়। পাহাড়ের সৌন্দর্য দেখার চেয়ে ‘চেক-ইন’ দেওয়াটা সেখানে বড় হয়ে দাঁড়ায়।
সবচেয়ে বিড়ম্বনার বিষয় হলো, মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত জীবন আজ বাজারের পণ্যে পরিণত হয়েছে। যে জীবনটা হওয়ার কথা ছিল ব্যক্তিগত আড়াল ও আশ্রয়ের সবচেয়ে নির্ভর জায়গা, আজ তা দেখনদারী করার তীব্র নেশায় সর্বজনীন প্রদর্শনীতে রূপান্তরিত হয়েছে। বেডরুম থেকে ড্রয়িংরুম—সবটাই যেন ক্যামেরার জন্য সাজানো সেট। নিজের জীবনের আনন্দ বা দুঃখকে আমরা আজ অন্যের লাইক-কমেন্টের পাল্লায় মাপছি। যখন ব্যক্তিগত মুহূর্তগুলো স্রেফ ‘কন্টেন্ট’ হিসেবে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ে, তখন সেই সম্পর্কের গভীরতা আর থাকে না। গোপনীয়তা বিসর্জন দিয়ে আমরা এক অদ্ভুত ভার্চুয়াল দাসে পরিণত হচ্ছি, যেখানে মুহূর্তটা যাপন করার চেয়ে তা মানুষকে দেখানোই মুখ্য হয়ে উঠছে।
মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে বিচার করলে, এই কৃত্রিমতা আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের এক অপূরণীয় ক্ষতি করছে। যখন একজন সাধারণ মানুষ অন্যের ‘এডিট করা’ জীবন বা সাজানো মুহূর্তগুলো দেখেন, তখন অবচেতনেই তিনি নিজের জীবনের অভাবগুলোর সাথে তার তুলনা করতে শুরু করেন। এই অসম প্রতিযোগিতা থেকে জন্ম নেয় তীব্র বিষণ্ণতা ও একাকীত্ব। তিনি ভুলে যান যে, যা তিনি দেখছেন তা আসলে কয়েক সেকেন্ডের একটা সুনিপুণ অভিনয় বা চিত্রনাট্য মাত্র। এই মিথ্যে শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই আমাদের ধৈর্য কমিয়ে দিচ্ছে এবং সম্পর্কের প্রতি দায়বদ্ধতাকেও আলগা করে দিচ্ছে। আগেকার দিনে মতভেদের মাঝেও একসাথে থাকার যে জেদ ছিল, আজ ফোনের ওপারে হাজারটা মেকি বিকল্পের হাতছানি সেই বাঁধন ছিঁড়ে দিচ্ছে।
সবচেয়ে আশঙ্কার কথা হলো আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে নিয়ে। তারা বড় হচ্ছে এই বিকৃত আদর্শকে ধ্রুবতারা মেনে। তারা শিখছে যে, ভেতরটা ফাঁপা হলেও বাইরের চাকচিক্য বজায় রাখাই জীবনের পরম সার্থকতা। তাদের কাছে ‘থাকা’র চেয়ে ‘দেখানো’র গুরুত্ব অনেক বেশি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। যদি এখনই আমরা সচেতন না হই এবং প্রযুক্তির এই মায়াজাল থেকে নিজেদের মুক্ত করতে না পারি, তবে আমাদের সমাজ থেকে সত্য, সততা এবং অকৃত্রিম আবেগগুলো চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। মানুষের অস্তিত্ব তখন কেবল কিছু মেগাবাইট আর পিক্সেলের হিসেবে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে।
তাই সময় এসেছে থমকে দাঁড়ানোর। আমাদের বুঝতে হবে, একটা অস্পষ্ট কিন্তু সত্যি হাসির দাম কয়েক হাজার লাইক পাওয়া ফিল্টার দেওয়া হাসির চেয়ে অনেক বেশি। পর্দার রঙিন মায়া কাটিয়ে আমাদের আবার রক্ত-মাংসের মানুষ হতে শিখতে হবে। জীবন মানে কেবল লেন্সবন্দি মুহূর্তের প্রদর্শনী নয়; জীবন মানে নিভৃতে কাটানো কিছু ভালো সময়, একে অপরের চোখের ভাষা বুঝতে পারা এবং মেকি মোড়কহীন এক পরম সত্য। এই সমূহ বিপদ থেকে রক্ষা পেতে হলে অকৃত্রিম অনুভূতির কাছে ফিরে যাওয়ার কোনো বিকল্প নেই।।
