
বছরের শুরু থেকেই কলকাতার আবহাওয়া বড় অদ্ভুত। কখনও মনে হচ্ছে হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় এবার সব রেকর্ড ভেঙে যাবে, আবার কখনও এক লাফে পারদ চড়ে বসার ইঙ্গিত দিচ্ছে। টানা দুদিন ১০ ডিগ্রির ঘরে থাকার পর বৃহস্পতিবার কলকাতার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা কিছুটা বাড়ল। আলিপুর আবহাওয়া দফতরের তথ্য অনুযায়ী, আজ মহানগরের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১১.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অথচ মঙ্গলবার এই পারদই নেমেছিল ১০.২ ডিগ্রিতে, যা গত ১৩ বছরে কলকাতার শীতলতম জানুয়ারি। তবে এই ১.৩ ডিগ্রি তাপমাত্রার বৃদ্ধি কি শীতের বিদায় ঘণ্টা? আবহাওয়াবিদদের উত্তর— এখনই অতটা ভাবার কারণ নেই।
আশেপাশের জেলায় শৈত্যপ্রবাহের ভ্রুকুটিলক্ষ করা যাচ্ছে। কলকাতায় সামান্য স্বস্তি মিললেও দক্ষিণবঙ্গের পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে পরিস্থিতি বেশ কঠিন। পুরুলিয়া ও বাঁকুড়ায় এখনও উত্তুরে হাওয়া যেন হুল ফোটাচ্ছে। সেখানে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৭ থেকে ৯ ডিগ্রির আশেপাশে ঘোরাফেরা করছে। গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গের জেলা যেমন মুর্শিদাবাদ ও নদীয়াতেও ঘন কুয়াশার দাপট বজায় রয়েছে। সকালের দিকে জাতীয় সড়কে দৃশ্যমানতা এতটাই কম থাকছে যে থমকে যাচ্ছে যানচলাচল।
অন্যদিকে, উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ি ও শিলিগুড়িতে এখন কার্যত ‘কোল্ড ডে’ পরিস্থিতি। পাহাড়ি এলাকা থেকে নেমে আসা কনকনে ঠান্ডা হাওয়া ডুয়ার্সের সমতলে এমন এক আস্তরণ তৈরি করেছে যে রোদের দেখা মেলাই ভার। ফলে দিনের বেলাতেও মানুষের সঙ্গীন দশা।
আবহাওয়াবিদদের মতে, মঙ্গলবার কলকাতার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল মাত্র ১৮ ডিগ্রি, যা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৭ ডিগ্রি কম ছিল। বর্তমানে বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ কমে যাওয়ায় কুয়াশার আস্তরণ কিছুটা পাতলা হয়েছে। মেঘ সরে রোদ ওঠায় বুধবার বেলা বাড়তেই সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বেড়ে ২২ ডিগ্রিতে পৌঁছায়। তবে শুক্রবার থেকে ফের বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বাড়বে। ফলে কুয়াশা ঘন হবে এবং সূর্যের তেজ কমবে। এর প্রভাব পড়বে সরাসরি সর্বোচ্চ তাপমাত্রার ওপর। অর্থাৎ সপ্তাহান্তে দিনের বেলাতেও ফের কনকনে ঠান্ডার অনুভূতি ফিরবে।
সপ্তাহান্তের পূর্বাভাস
হাওয়া অফিসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, শুক্রবার থেকে বাতাসে ফের জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বাড়তে শুরু করবে। এর ফলে:
- কুয়াশার আস্তরণ ফের ঘন হবে এবং সূর্যের আলো আসতে বাধা পাবে।
- এর ফলে সপ্তাহান্তে দিনের বেলাতেও পারদ ফের নামতে শুরু করবে।
- উত্তরবঙ্গ থেকে দক্ষিণবঙ্গ— সর্বত্রই দিনের বেলা ঠান্ডা বাড়বে।
সামগ্রিকভাবে, মকর সংক্রান্তির আগে তিলোত্তমা থেকে শিলিগুড়ি, সর্বত্রই ফের জাঁকিয়ে শীত পড়ার সম্ভাবনা উজ্জ্বল। আলিপুর আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, আপাতত তাপমাত্রা স্বাভাবিকের নিচেই থাকবে, তাই শীতপ্রেমীদের এখনই নিরাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই।
এবারের শীত শহরবাসীকে এক অদ্ভুত নস্টালজিয়ায় ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। গত কয়েকদিন কলকাতার রাজপথে কানটুপি, মাফলার আর লম্বা ওভারকোটে যে ছবি দেখা গেছে, তা যেন তিলোত্তমাকে হুবহু উত্তরের কোনো শৈলশহরের রূপ দিয়েছে। ময়দানের কুয়াশামাখা সকাল হোক বা ভিক্টোরিয়ার সামনে হালকা রোদে পিঠ দিয়ে বসা— শহরবাসী এবার কলকাতায় বসেই যেন দার্জিলিঙের আস্বাদ পেয়েছে।
শীত কেবল তাপমাত্রার পারদ নয়, এটি বাঙালির এক আবেগের নাম। চায়ের দোকানে ধোঁয়া ওঠা ভাড় হাতে আড্ডা হোক বা মধ্যবিত্তের রান্নাঘরে নলেন গুড়ের পিঠে-পুলি— ঠান্ডার এই দীর্ঘস্থায়ী কামড় এক অন্যরকম উৎসবের আবহ তৈরি করেছে। বিশেষ করে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা যেভাবে কমেছে, তাতে গত কয়েকদিন দুপুরের রোদেও সেই চেনা জ্বালা ছিল না, বরং ছিল এক আরামদায়ক পরশ। উত্তরবঙ্গের পাহাড়ের যে কুয়াশা আর হাড়কাঁপানো ঠান্ডার গল্প শুনে আমরা অভ্যস্ত, এবার যেন খাস কলকাতা আর তার পার্শ্ববর্তী জেলাগুলো সেই গল্পেরই অংশ হয়ে উঠেছে।
আগামী কয়েকদিন এই শীতের মেজাজ বজায় থাকবে। সপ্তাহান্তে যখন পারদ ফের নামবে, তখন তিলোত্তমার অলিগলিতে ফের সেই চেনা ‘দার্জিলিং ফিল’ ফিরে আসবে। তাই এখনই আলমারিতে গরম পোশাক তুলে রাখার ভুল করবেন না, কারণ শীতের শেষ কামড়টা বোধহয় এখনও বাকি আছে।।
