
রাজনীতির আকাশে আজ ঘন মেঘ। গণতন্ত্রের মাঠে যে খেলাটা চলার কথা ছিল আলো-ছায়ার মধ্যে, তা ক্রমে রূপ নিচ্ছে একপেশে কুস্তিতে। যেখানে এক পক্ষের হাতে বাঁশ, অন্য পক্ষের হাতে কেবল প্রশ্ন। রাজ্যের প্রশাসনিক কেন্দ্র থেকে রাজনৈতিক কর্মক্ষেত্র সবখানেই এক অদ্ভুত ছায়া নেমে এসেছে। বার বার আঙুল উঠছে মুখ্যমন্ত্রীর দিকে, যেন রাজ্যের যাবতীয় জটিলতার উৎস একটিমাত্র মুখ। অথচ গণতন্ত্রের সৌন্দর্য তো বহুত্বে, ভিন্নমতে, নানা কণ্ঠের সহাবস্থানে।
আজ রাজনীতিতে যে ভাষা শোনা যাচ্ছে, তা প্রশ্ন তোলার ভাষা নয়, বরং দোষ চাপানোর অভ্যাস। ক্ষমতার কেন্দ্রে বসে থাকা শক্তি যেন ঠিক করে নিয়েছে কে অপরাধী আর কে নির্দোষ। তদন্তের নামে অভিযানের ছবি প্রতিদিন ভেসে ওঠে, অফিস, কর্মক্ষেত্র, রাজনৈতিক পরিসর, সব জায়গাই যেন সন্দেহের তালিকায়। কোথাও হানা পড়ে, কোথাও পড়ে না। এই বেছে নেওয়ার রাজনীতি সাধারণ মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তোলে। প্রশ্ন তোলা গণতন্ত্রের প্রাণ, কিন্তু প্রশ্নের জবাব যদি নীরবতা হয়, তাহলে সেই প্রাণের শ্বাস আটকে আসে।
রাজ্যের শাসক দলকে বার বার অপমান করা হচ্ছে, আঘাত করা হচ্ছে তাদের কর্মপদ্ধতিকে। কিন্তু অপমানের রাজনীতি কখনও বিকল্প সৃষ্টি করতে পারে না। অপমান কেবল বিভাজন বাড়ায়, অবিশ্বাস গভীর করে। গণতন্ত্রে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে, মতভেদ থাকবে, কিন্তু সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা যদি প্রতিহিংসায় বদলে যায়, তবে খেলার মাঠটাই ভেঙে পড়ে। তখন জয় আর পরাজয়ের হিসেব থাকে, ন্যায় আর অন্যায়ের ভারসাম্য থাকে না।
আজকের পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটা উঠে আসে সমতার জায়গা থেকে। আইন কি সকলের জন্য এক? নাকি আইন কখনও শক্তির ছায়ায় নরম, কখনও বিরোধীর ঘাড়ে ভারী। রাজনীতির আঙিনায় যখন নিরপেক্ষতার মুখোশ খুলে পড়ে, তখন সাধারণ মানুষ বুঝে যায় খেলা কোথায় বাঁক নিচ্ছে। গণতন্ত্র কেবল ভোটের দিনে নয়, প্রতিদিনের আচরণে বেঁচে থাকে। প্রশাসনিক ক্ষমতার ব্যবহার যদি রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত হয়, তবে সেই অস্ত্রের ধার শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রকেই কেটে ফেলে।
রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর দিকে যে বার বার আঙুল উঠছে, তার আড়ালে লুকিয়ে আছে আরেক বাস্তবতা। একটি নির্বাচিত সরকারের প্রতি অনাস্থা তৈরি করার চেষ্টা। যেন বলা হচ্ছে ভোটের রায় যথেষ্ট নয়, কেন্দ্রের সিলই শেষ কথা। এই মানসিকতা রাজ্য ও কেন্দ্রের সম্পর্ককে দুর্বল করে, ফেডারাল কাঠামোকে ক্ষতবিক্ষত করে। রাজ্যের স্বাধিকার কেবল প্রশাসনিক শব্দ নয়, তা মানুষের সম্মানের প্রশ্ন।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, এই পরিবেশে রাজনীতির ভাষা মানুষের ভাষা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। উন্নয়ন, কাজ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, এই শব্দগুলো চাপা পড়ে যাচ্ছে তদন্ত, হানা, অভিযোগের শোরগোলে। গণতন্ত্রের আসল কাজ মানুষের জীবনে স্বস্তি আনা, কিন্তু আজ রাজনীতি মানুষের মনে কেবল আশঙ্কা ঢুকিয়ে দিচ্ছে।
প্রশ্ন তোলা জরুরি। প্রশ্ন কাদের বিরুদ্ধে নয়, প্রশ্ন পদ্ধতির বিরুদ্ধে। গণতন্ত্র বিপন্ন হয় তখনই, যখন ক্ষমতা নিজেকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে মনে করে। আজ সেই বিপদের ঘণ্টা শোনা যাচ্ছে স্পষ্টভাবে। এখন দেখার, এই শব্দ উপেক্ষা করা হয়, নাকি গণতন্ত্রকে বাঁচানোর জন্য নতুন করে শোনা শুরু হয়।
