
নীলাঞ্জন দাশগুপ্ত
বাংলার রাজনীতির আকাশ আজ আর ধূসর নয়, ঘন কালো। একটার পর একটা কেলেঙ্কারির স্তূপে দাঁড়িয়ে তৃণমূল কংগ্রেস আজ যেন নিজেই নিজের ছায়াকে ভয় পাচ্ছে। কয়লা পাচার, গরু পাচার, নিয়োগ দুর্নীতি এই শব্দগুলো আর বিচ্ছিন্ন কোনো খবর নয়, এক সুতোয় গাঁথা একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি। যে সংস্কৃতি ক্ষমতাকে সেবা নয়, লুটের লাইসেন্স মনে করে। যে সংস্কৃতি প্রশাসনকে ঢাল বানিয়ে দুর্নীতিকে শিল্পে রূপ দেয়। বছরের পর বছর ধরে এই আবর্জনার পাহাড় জমতে জমতে আজ এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে প্রশ্ন করা অপরাধ আর সন্দেহ করাই রাষ্ট্রদ্রোহের মতো আচরণ।
এই আবহেই I – PAC-এর দপ্তরে ইডির হানা যেন হঠাৎ আকাশ ফাটানো বজ্রপাত নয়, বরং বহুদিনের জমে থাকা মেঘের স্বাভাবিক বিস্ফোরণ। যে রাজনৈতিক কারখানা ভোটকে পণ্য বানায়, কৌশলকে নৈতিকতার ঊর্ধ্বে বসায়, তার অন্দরমহলে অস্বস্তি ঢুকবে না, এমনটা ভাবাই ছিল বোকামি। রাজনীতিকে ব্র্যান্ডিং, মানুষকে ডেটা আর ভোটকে প্রজেক্টে নামিয়ে আনার এই ব্যবস্থায় স্বচ্ছতার জায়গা কোথায়? প্রশ্নটা তাই শুধু তৃণমূলকে ঘিরে নয়, পুরো সেই ইকোসিস্টেমকে নিয়ে, যেখানে ক্ষমতার আশেপাশে ঘোরাফেরা করলেই দায় এড়ানো যায় বলে মনে করা হয়।
তৃণমূলের শাসন যেন এক দীর্ঘ নাটক, যেখানে মঞ্চে আলো পড়ে কিছু মুখে, কিন্তু পর্দার আড়ালে চলতে থাকে অদৃশ্য হাতের খেলা। কয়লা খনি থেকে সীমান্ত, শিক্ষা দপ্তর থেকে পঞ্চায়েত, সবখানেই একই গন্ধ। এই গন্ধ কোনো আলাদা ঘটনার নয়, এটি অভ্যাসের। নিয়োগ দুর্নীতিতে যুবসমাজের ভবিষ্যৎ বিক্রি হয়ে যায়, অথচ রাজনৈতিক ক্ষমতার আসনে বসে থাকা মুখগুলো থাকে নির্বিকার। গরু পাচারে সীমান্ত রক্তাক্ত হয়, কিন্তু ক্ষমতার অলিন্দে নীরবতা রাজত্ব করে। কয়লা পাচারে রাজ্যের সম্পদ পুড়ে ছাই হয়, অথচ শাসকের ভাষণে উন্নয়নের রঙিন পোস্টার ঝোলে।
I – PAC-এর প্রসঙ্গ সেই ছবিতে নতুন রং যোগ করে না, বরং পুরোনো ছবির রেখাগুলোকে আরও গাঢ় করে। যে রাজনৈতিক যন্ত্র এতদিন ধরে ভোটের অঙ্ক কষে এসেছে, আজ সেই অঙ্কের খাতায় কালির দাগ পড়ছে। এখানে প্রশ্ন দোষ প্রমাণের আইনি জটিলতায় আটকে নেই, প্রশ্ন নৈতিকতার। রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হলেই কি সবকিছু বৈধ হয়ে যায়? ক্ষমতার কাছাকাছি থাকলেই কি দায়িত্ব ঝরে পড়ে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে গিয়ে তৃণমূলের মুখে যে অস্বস্তি, সেটাই আসল স্বীকারোক্তি।
এই শাসনব্যবস্থা মানুষের মনে ভয়ের সংস্কৃতি গড়ে তুলেছে। চাকরি চাইলে চুপ থাকতে হয়, প্রশ্ন করলে ট্যাগ জোটে, প্রতিবাদ করলে মামলা। ক্ষমতার চারপাশে এক অদ্ভুত সুরক্ষা বলয়, যেখানে সত্য ঢুকতে পারে না। আর সেই বলয়ের বাইরে দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষ শুধু দেখে যায়, কীভাবে একের পর এক দুর্নীতির গল্প নতুন মোড় নেয়, নতুন চরিত্র যোগ হয়, কিন্তু শেষটা আর আসে না। I – PAC-এর দপ্তরে ইডির হানা সেই শেষের শুরু কিনা, তা সময় বলবে, কিন্তু এটুকু স্পষ্ট, তৃণমূলের নৈতিক জমি বহু আগেই ধসে গেছে।
ইডির হানার খবর ছড়িয়ে পড়তেই দৃশ্যপট বদলে যায় চোখের পলকে। যেন আগুন লাগার শব্দ পেয়েই ক্ষমতার কেন্দ্রে অস্থিরতা ছুটে আসে নিজের ছায়া বাঁচাতে। প্রশাসনিক তল্লাশির মধ্যেই রাজনীতির হস্তক্ষেপ ঢুকে পড়ে, আর সেই তড়িঘড়ি উপস্থিতি নিজেই অনেক প্রশ্নের জন্ম দেয়। কোথাও যদি কিছুই লুকোনোর না থাকে, তবে এই তাড়াহুড়ো কেন, এই অস্বস্তি কেন? এই প্রশ্নগুলো বাতাসে ঝুলে থাকে, উত্তরহীন। ইডির হাত থেকে নথি সরানোর অভিযোগ রাজনীতির মঞ্চে নতুন নাটকের পর্দা তোলে, যেখানে ক্ষমতা আর তদন্ত মুখোমুখি দাঁড়িয়ে একে অপরকে চোখে চোখ রেখে মাপতে থাকে।
তল্লাশির ঘর থেকে নথি সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ যেন পুরো ঘটনাকে আরও ঘোলাটে করে দেয়। কাগজ শুধু কাগজ থাকে না, সেগুলো হয়ে ওঠে স্মৃতি, হিসাব আর লুকোনো সত্যের বাহক। সেগুলো কার হাতে গেল, কোন উদ্দেশ্যে গেল, এই প্রশ্নগুলোর ভার রাজনীতির বুকের ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করে। ইডি সূত্রে যে আলাদা করে বিষয়গুলি খতিয়ে দেখার কথা সামনে আসে, তা কেবল একটি প্রক্রিয়ার ঘোষণা নয়, বরং ইঙ্গিত, এই গল্প এখানেই থামছে না। তদন্তের ফাইল খুললে যেমন ধুলো ওড়ে, তেমনই ওড়ে বহুদিনের জমে থাকা ভয়ের কণা, যা এতদিন ক্ষমতার ছায়ায় চাপা ছিল।
এই গোটা প্রেক্ষাপটে তৃণমূলের রাজনৈতিক আচরণ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ক্ষমতার খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে থাকা মানেই যেন আগুন লাগলে আগে জল ঢালার চেষ্টা, পরে সত্যের হিসাব। ইডির হানা, তড়িঘড়ি উপস্থিতি, নথি নিয়ে টানাটানি, সব মিলিয়ে এটি আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা থাকে না। এটি হয়ে ওঠে সেই পুরোনো ছবিরই আরেকটি দৃশ্য, যেখানে ক্ষমতা নিজেকে বাঁচাতে গিয়ে আরও বেশি প্রশ্ন ডেকে আনে। আর সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গিয়েই ধীরে ধীরে খুলে যেতে থাকে একের পর এক বন্ধ দরজা।
আজ বাংলা এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে প্রশ্ন শুধু কে দোষী তা নয়, প্রশ্ন এই ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ কী। দুর্নীতিকে স্বাভাবিক করে তোলা, ক্ষমতার অপব্যবহারকে রাজনীতির কৌশল বলে চালানো, এই পথের শেষ কোথায়? তৃণমূল আজ যে অবস্থানে, তা কোনো হঠাৎ ঝড়ে তৈরি হয়নি। এটি বছরের পর বছর ধরে বোনা এক অন্ধকার জালের ফল। I – PAC হোক বা অন্য কেউ, সেই জালের প্রতিটি সুতোই এখন টান পড়ছে। আর সেই টানেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে একটি দল নয়, একটি শাসনদর্শনের নগ্ন রূপ।
