
গঙ্গাসাগর মেলা উপলক্ষে রাজ্য সরকার এবং পূর্ব রেলের সমন্বয়ে এবার নজিরবিহীন নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রতি বছরই মকর সংক্রান্তিতে পুণ্যস্নানের জন্য দেশ-বিদেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ সাগরে পাড়ি দেন। তবে এ বছর ভিড় আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। জেলা প্রশাসনের অনুমান, এবার প্রায় এক কোটির বেশি মানুষের সমাগম হতে পারে। এই বিশাল জনস্রোত সামাল দিতে এবং কোনো রকম অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে মহাকাশ বিজ্ঞানের প্রযুক্তিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে প্রশাসন।
এবারের মেলার প্রধান আকর্ষণ হলো ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরোর ‘নেভি সি’ (NavIC) প্রযুক্তির ব্যবহার। মোট সাতটি স্যাটেলাইট এবং গ্রাউন্ড স্টেশনের মাধ্যমে এই নেটওয়ার্ক কাজ করবে। এর ফলে ভিড়ের একদম নিখুঁত এবং রিয়েল-টাইম তথ্য প্রশাসনের কন্ট্রোল রুমে পৌঁছে যাবে। মেলা প্রাঙ্গণের কোথায় কত মানুষ জমায়েত হয়েছেন বা কোথায় চাপের সৃষ্টি হচ্ছে, তা মুহূর্তের মধ্যে জানা সম্ভব হবে।
এছাড়া নিরাপত্তার চাদরে মুড়ে ফেলা হয়েছে পুরো এলাকাকে:
- ১,২০০-র বেশি সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হয়েছে।
- দিনের বেলার ড্রোনের পাশাপাশি রাতে নজরদারির জন্য ‘থার্মাল ইমেজিং’ ড্রোন ব্যবহার করা হবে।
- নিরাপত্তার জন্য মোতায়েন থাকছে এনডিআরএফ, রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী এবং কিউআরটি।
- ভিড় নিয়ন্ত্রণে ১০,০০০ স্বেচ্ছাসেবক এবং ২,৫০০ সিভিল ডিফেন্স কর্মী কাজ করবেন।
যাতায়াতে একগুচ্ছ স্পেশাল ট্রেন ও বাস
পুণ্যার্থীদের যাতায়াত মসৃণ করতে পূর্ব রেল বড় পদক্ষেপ নিয়েছে। গত বছর যেখানে ৭২টি বিশেষ ট্রেন চালানো হয়েছিল, এবার সেই সংখ্যা বাড়িয়ে ১২৬টি করা হয়েছে। আগামী ১৬ জানুয়ারি পর্যন্ত শিয়ালদা থেকে নামখানা এবং কাকদ্বীপের মধ্যে এই ট্রেনগুলো চলবে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এবার রাত ১২টা থেকে ভোর ৪টের মধ্যেও ট্রেনের পরিষেবা মিলবে, যা আগে সাধারণত বন্ধ থাকত।
সড়ক ও জলপথের প্রস্তুতিও তুঙ্গে:
বাস পরিষেবা: কলকাতা ও হাওড়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রায় ২,৫০০ বাস চালানো হবে।
জলপথ: মোট ২১টি জেটি সক্রিয় রাখা হয়েছে। লট নম্বর ৮ এবং নামখানায় থাকছে ১০০টি লঞ্চ, ৪৫টি ভেসেল ও ১৩টি বার্জ।
এক টিকিটেই সফর: পুণ্যার্থীদের সুবিধার কথা ভেবে হাওড়া বা কলকাতা থেকে কচুবেড়িয়া পর্যন্ত যাওয়া-আসার জন্য একটি সমন্বিত টিকিটের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
গাড়ির জট এড়াতে বাবুঘাট থেকে সাগর পর্যন্ত ১৬টি বাফার জোন তৈরি করা হয়েছে। যাতায়াতের পথে প্রায় ৫৪ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে ব্যারিকেড দেওয়া হয়েছে যাতে ভিড় কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে না যায়।
গঙ্গাসাগর মেলা মানেই কেবল ভিড় বা প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা নয়, এটি আসলে ভক্তি আর আধ্যাত্মিকতার এক মিলনক্ষেত্র। সাগরের বালুতট জুড়ে গড়ে ওঠা অস্থায়ী আস্তানায় দেখা যায় দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা হাজার হাজার সন্ন্যাসী ও নাগা সাধুদের। শিয়ালদা স্টেশনে পা রাখলেই কানে আসে শঙ্খধ্বনি আর ‘গঙ্গামাই কি জয়’ ধ্বনি। কেউ হিমালয় থেকে এসেছেন, কেউ বা সুদূর দক্ষিণ ভারত থেকে— প্রত্যেকেরই লক্ষ্য মকর সংক্রান্তির সেই মাহেন্দ্রক্ষণে পুণ্যস্নান সেরে কপিলমুনি মন্দিরে আশীর্বাদ নেওয়া।
রঙিন ঝাণ্ডা, ধুনোর ধোঁয়া আর সাধু-সন্ন্যাসীদের ভিড়ে গঙ্গাসাগরের সৈকত যেন এক টুকরো মিনি কুম্ভ হয়ে ওঠে। এই বিপুল জনসমাগমের নিরাপত্তা ও ধর্মীয় ভাবাবেগ অক্ষুণ্ণ রাখতেই প্রশাসন এবার আধুনিক প্রযুক্তি ও ঐতিহ্যের মেলবন্ধন ঘটিয়েছে। পুণ্যার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একদিকে যেমন আকাশ থেকে নজর রাখছে ইসরোর স্যাটেলাইট, অন্যদিকে মেলার অলিগলিতে অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে কাজ করছে হাজার হাজার সেচ্ছাসেবক সাথে আছে সিসিটিভি । সব মিলিয়ে, সাগরের এই পবিত্র প্রাঙ্গণে পুণ্যার্থীদের যাত্রাকে নির্বিঘ্ন করতে সব দিক থেকেই প্রস্তুত প্রশাসন। সব মিলিয়ে, আধ্যাত্মিক এই মিলন উৎসবকে সুরক্ষিত এবং সফল করতে প্রযুক্তি ও প্রশাসনিক শক্তির এক অনন্য মেলবন্ধন দেখা যাচ্ছে এবারের গঙ্গাসাগর মেলায়।।
