
ভোরের আলো যখন ধীরে ধীরে গঙ্গার জলে রঙ মেশায়, তখন বাতাসে এক ধরনের নীরব জাগরণ ঘটে। সেই জাগরণে শোনা যায় দূরের ঘণ্টাধ্বনি, কাছের মানুষের নিঃশ্বাস, আর আত্মার গভীর থেকে উঠে আসা প্রশ্নের মৃদু শব্দ। এই আলো, এই প্রশ্ন, এই অনির্বচনীয় স্পর্শের মাঝখানে যেন একটি মুখ ভেসে ওঠে, তেজস্বী, শান্ত, অদম্য। সময়ের সীমা ভেঙে তিনি দাঁড়িয়ে থাকেন, চোখে আগুন আর হৃদয়ে করুণা। এইভাবেই স্বামী বিবেকানন্দের উপস্থিতি অনুভূত হয়, কোনো ইতিহাসের পাতায় নয়, জীবনের প্রতিটি স্পন্দনে।
শৈশবের কলকাতার অলিগলিতে তাঁর পদচারণা ছিল কৌতূহল আর সাহসের মিশ্রণ। পড়াশোনার খাতায় যেমন তীক্ষ্ণতা, তেমনি খেলাধুলোর মাঠে ছিল উন্মুক্ত আকাশের আহ্বান। প্রশ্ন করতে তিনি ভয় পেতেন না, উত্তর না পেলেও থামতেন না। এই প্রশ্নগুলো তাঁকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল এমন এক সন্ধানের পথে, যেখানে যুক্তি আর অনুভব একে অপরের হাত ধরেছিল। সেই পথে গুরু-শিষ্যের সম্পর্ক নতুন রূপ পেয়েছিল, যেখানে শ্রদ্ধা ছিল গভীর, কিন্তু বোধ ছিল মুক্ত। রামকৃষ্ণের সান্নিধ্যে তিনি শিখেছিলেন হৃদয়ের ভাষা, যা বইয়ের অক্ষর ছাড়িয়ে জীবনের দিকে তাকাতে শেখায়।
যখন তিনি সন্ন্যাসের পথ বেছে নিলেন, তখন তা ছিল পালিয়ে যাওয়া নয়, বরং আরও গভীরে প্রবেশ করা। ভারতের গ্রাম থেকে নগর, পাহাড় থেকে সমতল এই ভ্রমণে তিনি দেখেছিলেন দারিদ্র্য, অসহায়তা, আর তবু অটুট প্রাণশক্তি। মানুষের চোখে তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন সম্ভাবনার আলো, যা একটু যত্ন পেলেই জ্বলে উঠতে পারে। এই দেখা তাঁকে বদলে দিয়েছিল, তাঁর কণ্ঠে এনে দিয়েছিল এমন এক দৃঢ়তা, যা শোনামাত্র হৃদয়ে ঢেউ তোলে।
সমুদ্র পেরিয়ে পশ্চিমের মাটিতে পৌঁছেও তাঁর ভেতরের ভারত নিভে যায়নি। বরং নতুন ভাষা, নতুন শ্রোতার সামনে দাঁড়িয়ে সেই ভারত আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। তাঁর কথায় ছিল আত্মবিশ্বাসের উষ্ণতা, সংস্কৃতির গভীরতা, আর মানুষের প্রতি নিখাদ আস্থা। তিনি ভিন্নতার ভিড়ে ঐক্যের সুর শোনাতে পেরেছিলেন, কারণ তাঁর দৃষ্টিতে প্রতিটি মানুষ ছিল এক একটি সম্ভাবনার দ্বার। সেই মঞ্চে তিনি কেবল একজন বক্তা ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক সেতু, যা দূরের তীরগুলোকে কাছাকাছি এনে দেয়।
ফিরে এসে তাঁর কাজ আরও বিস্তৃত হয়। শিক্ষা, সেবা, আধ্যাত্মিকতা, এই সবকিছুকে তিনি আলাদা খোপে রাখেননি। মানুষের জীবনে জ্ঞান আর কর্মকে একসাথে প্রবাহিত হতে দেখতেই তিনি আনন্দ পেতেন। তরুণদের চোখে তিনি দেখতে চাইতেন সাহস, হাতে কাজ, আর মনে স্বপ্ন। তাঁর ভাবনায় ধর্ম ছিল জীবনের সহায়, জীবনের প্রতিবন্ধক নয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি আজও সময়ের কোলাহলে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।
স্বামী বিবেকানন্দকে ভাবলে মনে হয় এক চলমান আগুন, যা পোড়ায় না, আলোকিত করে। তাঁর জীবন কোনো স্থির মূর্তি নয়, বরং একটি আহ্বান, যা নীরবে কানে এসে লাগে। সেই আহ্বান আমাদের নিজের ভেতরে তাকাতে শেখায়, শক্তিকে চিনতে শেখায়, আর মানুষকে ভালোবাসার সাহস দেয়। গঙ্গার জলে যেমন ভোরের আলো মিশে যায়, তেমনি তাঁর ভাবনা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে মিশে থাকে, অদৃশ্য অথচ গভীরভাবে উপস্থিত।
