
রাতের অন্ধকারে একটি কুপি জ্বলছে। বাইরে নীরবতা, ভেতরে এক বিপ্লবীর নিঃশ্বাস। কারাগারের সেই নির্জন কোণায় বসে সূর্য সেন পড়ছেন বই! কখনও মহাভারত আবার কখনও রবীন্দ্রনাথ। তাঁর কাছে বিপ্লব মানে শুধু অস্ত্র নয়, বিপ্লব মানে মনকে জাগ্রত রাখা, আত্মাকে প্রস্তুত করা।
মাস্টারদা সূর্য সেন ছিলেন এমন এক মানুষ, যাঁর জীবনে আদর্শ আর সাহস একে অন্যের হাত ধরেই হেঁটেছে। চট্টগ্রামের অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের নায়ক হয়েও তিনি ভাবতেন মানুষের ভিতরের শক্তির কথা। কারাগারে বন্দি থেকেও তাঁর মন ছিল মুক্ত, আকাশের মতো বিস্তৃত। ফাঁসির আগে লেখা চিঠিতে তিনি ভবিষ্যৎ ভারতের হাতে তুলে দিয়েছিলেন একটিই সম্পদ! স্বাধীন ভারতের স্বপ্ন।
বিপ্লবের পথে মেয়েদের ভূমিকা নিয়েও তিনি ছিলেন সময়ের থেকে অনেক এগিয়ে। কল্পনা দত্ত কিংবা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার! এই নামগুলি তাঁর নেতৃত্বেই ইতিহাসে অমর হয়ে আছে। প্রীতিলতার চোখে তিনি দেখেছিলেন অহংকারহীন দীপ্তি, একাগ্রতা আর আত্মত্যাগের আগুন। ইউরোপিয়ান ক্লাব অভিযানের আগে প্রীতিলতার সেই কথা আজও কানে বাজে! মেয়েরা দুর্বল নয়, এই ভুল ধারণা ভাঙতেই তিনি জীবন দিতে প্রস্তুত।
সূর্য সেনের শৈশব কেটেছিল কর্ণফুলী নদীর ধারে নয়াপাড়ায়। স্কুলজীবন থেকেই বই আর ভাবনার সঙ্গে তাঁর গভীর সম্পর্ক। নবীনচন্দ্র সেনের দেশাত্মবোধক কবিতা, বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দমঠ’, দেউস্করের ‘দেশের কথা’ সব মিলিয়ে তাঁর চিন্তাজগৎ ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছিল। শিক্ষকতা করতে গিয়েই তিনি হয়ে উঠলেন ছাত্রদের ‘মাস্টারদা’। শুধু পড়ানোর জন্য নয়, মানুষ গড়ার জন্য।
বিপ্লবী জীবন তাঁকে সংসার থেকে দূরে রেখেছিল। স্ত্রী পুষ্পকুন্তলার সঙ্গে সম্পর্ক ছিল না অভিমানহীন, কিন্তু নিঃশব্দ যন্ত্রণায় ভরা। তবু সূর্য সেন বিশ্বাস করতেন, বিপ্লবীকে হতে হবে সন্ন্যাসীর মতো, লোভ, কাম, ক্রোধ থেকে মুক্ত। ব্যক্তিগত সুখের ত্যাগেই তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন বৃহত্তর মুক্তির পথ।
জেলে তাঁর সঙ্গী ছিল চারটি বই! গীতা, চণ্ডী, মহাভারত আর রবীন্দ্রনাথের ‘চয়নিকা’। ভোরে স্তোত্রপাঠ, দিনে পাঠচর্চা, আর রাতে চিন্তার গভীরতা। মৃত্যুকে তিনি ভয় পাননি। বরং মৃত্যুর সৌন্দর্য নিয়ে লিখেছেন, কবি আর দার্শনিকেরা কীভাবে তাকে মহিমান্বিত করেছেন। তাঁর চোখে মৃত্যু ছিল নতুন যাত্রার দ্বার।
১৯৩৪ সালের ১২জানুয়ারি সূর্য সেনের ফাঁসি হয়। ব্রিটিশ শাসকরা তাঁর দেহ পর্যন্ত পরিবারের হাতে তুলে দেয়নি। কিন্তু তারা বুঝতে পারেনি, একজন সূর্য সেনকে মেরে ফেলা যায়, তাঁর স্বপ্নকে নয়। সেই স্বপ্ন আজও বেঁচে আছে ইতিহাসের পাতায়, বিপ্লবের গল্পে, আর প্রতিটি স্বাধীনচেতা মানুষের মনে।
কারাগারের অন্ধকারে বসে যে মানুষটি বই পড়তেন, তিনি জানতেন, স্বাধীনতার পথ দীর্ঘ, কণ্টকাকীর্ণ, তবু সেই পথেই হাঁটতে হবে। কারণ সেই পথের শেষে অপেক্ষা করে আছে মুক্ত আকাশ, স্বাধীন ভারতের স্বপ্ন।
