
কারখানা গেল, স্বপ্ন গেল, পোস্টারে শুধুই হাসি
কাজ নেই তবু উন্নয়নের গল্পে ভরে গেল বাসি বুলি রাশি
ন্যানোর মতো কারখানা আর হল কোথায়? এই প্রশ্নটা আজ আর শুধুই প্রশ্ন নয়, এটা একটা ক্ষত। যে ক্ষত পনেরো বছর ধরে রক্ত ঝরাচ্ছে, অথচ শাসকের মুখে তার কোনো অস্তিত্বই নেই। যে সিঙ্গুর ছিল সম্ভাবনার নাম, ভবিষ্যতের দরজা, বাংলার শিল্পায়নের একমাত্র জানালা। সেই জানালা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল রাজনীতির হাতুড়ি দিয়ে। বলা হয়েছিল জমি বাঁচানো হয়েছে, কৃষক বাঁচানো হয়েছে, বাংলার মাটি রক্ষা করা হয়েছে। আজ পনেরো বছর পর দাঁড়িয়ে দেখা যাচ্ছে মাটি আছে, কিন্তু মাটির উপর কাজ নেই, আকাশ আছে, কিন্তু উড়ান নেই, মানুষ আছে, কিন্তু কাজ নেই।
যে রাজ্য একদিন শিল্পের জন্য পরিচিত ছিল, যেখানে কাজের খোঁজে বাইরে যেতে হতো না, আজ সেখানে যুবসমাজ ট্রেনের কামরায় ঝুলে অন্য রাজ্যের স্বপ্ন কিনছে। হাতের ডিগ্রি ধুলো খাচ্ছে, চোখের স্বপ্ন শুকিয়ে যাচ্ছে। শাসক দল তখন উৎসবের আলোয় ছবি তোলে, পোস্টারে উন্নয়নের গল্প লেখে, আর বাস্তবে কর্মসংস্থানের খাতা ফাঁকা পড়ে থাকে। সিঙ্গুরের পর আর কোনো সিঙ্গুর হলো না, কারণ এই সরকার শিল্পকে ভয় পায়, বিনিয়োগকে সন্দেহ করে, আর কর্মসংস্থানকে রাজনৈতিক শত্রু মনে করে।
কারখানা মানেই নাকি শোষণ, এই গল্প শুনিয়ে বাংলাকে ফেরানো হলো অতীতে। যে রাজ্য একদিন দেশের অর্থনীতিতে নেতৃত্ব দিয়েছিল, তাকে বানানো হলো ভিক্ষার থালা। শিল্প এলেই নাকি মানুষের ক্ষতি হবে, এই ভয় দেখিয়ে মানুষকে কাজহীন রাখাই যেন শাসনের মূল দর্শন। অথচ অন্য রাজ্যগুলোতে একই জমিতে কারখানা হচ্ছে, কাজ হচ্ছে, মানুষ রুটি পাচ্ছে। সেখানে জমি উন্নয়নের হাত ধরে জীবিকা পাচ্ছে, আর বাংলায় জমি পড়ে আছে আগাছায় ভরা স্মৃতিসৌধ হয়ে।
পনেরো বছরে যদি দ্বিতীয় সিঙ্গুর না হয়, তার মানে এই নয় যে বাংলায় আর জমি নেই, এর মানে বাংলায় আর সাহস নেই। নেতৃত্বের সাহস নেই, সিদ্ধান্তের সাহস নেই, ভবিষ্যতের দিকে তাকানোর সাহস নেই। আছে শুধু ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার তাগিদ। ক্ষমতা বাঁচাতে শিল্পকে বলি দেওয়া হয়েছে, যুবকদের ভবিষ্যৎকে বন্ধক রাখা হয়েছে। শাসকরা জানে, কর্মসংস্থান হলে প্রশ্ন উঠবে, কাজ পেলে মানুষ হিসাব চাইবে, তাই কাজহীনতাই তাদের সবচেয়ে নিরাপদ রাজনীতি।
আজ বাংলার গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত একটাই কান্না শোনা যায়, কাজ কোথায়। এই প্রশ্নের জবাব নেই, আছে শুধু দোষারোপ, কেন্দ্রকে গালি, আগের সরকারকে দায়। কিন্তু পনেরো বছর ক্ষমতায় থাকার পরও যদি কর্মসংস্থানের ছবি শূন্য থাকে, তাহলে সেই শূন্যতাই সরকারের আসল পরিচয়। উন্নয়নের পোস্টার আর ভাতা নির্ভর রাজনীতি দিয়ে একটা প্রজন্মকে বাঁচানো যায় না। মানুষ কাজ চায়, সম্মান চায়, ভবিষ্যৎ চায়।
সিঙ্গুরের জমিতে আজও বাতাস বইলে শোনা যায় হারিয়ে যাওয়া সম্ভাবনার শব্দ। সেই শব্দ মনে করিয়ে দেয়, একদিন এখানে কারখানা হতে পারত, হাজার হাজার পরিবার রুটি পেত, বাংলা মাথা তুলে দাঁড়াতে পারত। কিন্তু রাজনীতির হিংসা, প্রতিহিংসা আর ক্ষমতার লোভ সেই সম্ভাবনাকে হত্যা করেছে। আজ সেই হত্যার দায় এড়ানো যায় না। ন্যানোর মতো কারখানা আর হল কোথায়? এই প্রশ্নের উত্তর না পাওয়াই তৃণমূলের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতার দলিল।
