
পৌষের সংক্রান্তি এলেই যেন বাংলার আকাশে-বাতাসে এক আলাদা মাধুর্য নেমে আসে। শীতের কোমল রোদ, কুয়াশা মাখা ভোর আর সন্ধ্যার নরম হাওয়া মিলেমিশে এই সময়টাকে করে তোলে বিশেষ। বছরের এই সময়টা শুধু একটি তিথি নয়, এটি বাঙালির স্মৃতি, আবেগ আর সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা এক অনুভূতি।
সংক্রান্তির আগে থেকেই ঘরে ঘরে শুরু হয়ে যায় প্রস্তুতি। চাল ভেজানো, গুঁড়ো করা, খেজুর গুড় জোগাড় করা, নারকেল কোরানো, সবকিছুতেই থাকে এক উৎসবের ছোঁয়া। রান্নাঘর তখন শুধুই রান্নার জায়গা থাকে না, হয়ে ওঠে আনন্দের মিলনক্ষেত্র। দিদা-ঠাকুমার অভিজ্ঞ হাত, মায়ের যত্ন আর নতুন প্রজন্মের কৌতূহল মিলিয়ে পিঠে তৈরির সেই মুহূর্তগুলো মনে গেঁথে থাকে আজীবন।
পিঠে মানেই শুধু খাবার নয়, পিঠে মানে গল্প। চালের গুঁড়োয় মিশে থাকে গ্রামের উঠোনের স্মৃতি, নারকেলের পুরে লুকিয়ে থাকে পারিবারিক উষ্ণতা, আর খেজুর গুড়ের মিষ্টতায় ধরা দেয় শীতের আসল স্বাদ। ভাপা, পাটিসাপটা, দুধপুলি, চিতই, প্রতিটা পিঠের আলাদা আলাদা স্বভাব, আলাদা আলাদা রস। সংক্রান্তির দিনে এই পিঠের থালাই যেন হয়ে ওঠে বাঙালির উৎসবের পরিচয়।
পৌষ সংক্রান্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো লক্ষ্মী পুজো। এই দিন ঘরদোর পরিষ্কার করে, মনটা শান্ত করে, বাঙালি ঘরের লক্ষ্মীকে আমন্ত্রণ জানায়। বিশ্বাস আর ভক্তির সঙ্গে জড়িয়ে থাকে সংসারের মঙ্গলকামনা। ধানের গোলা ভরা থাকুক, ঘরে সুখ-শান্তি বিরাজ করুক, এই চাওয়াগুলোই যেন পুজোর আসল কথা। প্রদীপের আলোয় ঘর আলোকিত হয়, ঠিক তেমনই আশায় আলোকিত হয় মন।
গ্রামবাংলায় এই সময়টায় সংক্রান্তি মানে আরও বেশি প্রাণের উৎসব। মাঠে মাঠে ফসল কাটার আনন্দ, উঠোনে উঠোনে আত্মীয়স্বজনের আনাগোনা, আর পিঠে ভাগাভাগি করে খাওয়ার সরল সুখ। শহরের ব্যস্ত জীবনে সেই দৃশ্য পুরোপুরি ধরা না পড়লেও, সংক্রান্তির দিনে মনটা অদ্ভুতভাবে গ্রামমুখী হয়ে যায়। ছোটবেলার স্মৃতি, শীতের ছুটি, সকালবেলার আগুন পোহানো, সবকিছু হঠাৎ করেই ফিরে আসে মনে।
পৌষ সংক্রান্তি আসলে বাঙালিকে একটু থামতে শেখায়। দ্রুতগতির জীবনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সে মনে করিয়ে দেয় শিকড়ের কথা। পরিবারের সঙ্গে বসে খাওয়া, একে অন্যের খোঁজ নেওয়া, পুরনো গল্পে ডুবে যাওয়া, এই সব ছোট ছোট মুহূর্তই জীবনকে করে তোলে পূর্ণ। আধুনিকতার ভিড়েও সংক্রান্তি তার নিজস্ব ছন্দ ধরে রাখে, বদলায় না তার স্বভাব।
এই সময়টায় প্রকৃতিও যেন বাঙালির সঙ্গেই উৎসবে মেতে ওঠে। ধানখেতের সোনালি রং, নীল আকাশ, শীতের সকালের নীরবতা, সব মিলিয়ে পৌষ সংক্রান্তি হয়ে ওঠে এক পরিপূর্ণ অনুভূতির নাম। এটি কেবল একটি দিনের উৎসব নয়, এটি বাঙালির মননের গভীরে প্রোথিত এক ঋতু-উৎসব।
পৌষের সংক্রান্তি তাই শুধু পিঠে, পুজো বা আচার নয়। এটি স্মৃতি আর বর্তমানের সেতু, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা এক আত্মিক আনন্দ। এই দিনটায় বাঙালি নিজের মতো করে বাঁচে, নিজের সংস্কৃতিকে ছুঁয়ে দেখে, আর মনের ভেতর জমে থাকা উষ্ণতাকে নতুন করে অনুভব করে।
