
কোচবিহারের রাজনৈতিক মানচিত্রে রবীন্দ্রনাথ ঘোষ কোনও সামান্য নাম নয়। দীর্ঘদিন ধরে পুরসভা, দলীয় সংগঠন আর ক্ষমতার অলিন্দে তাঁর চলাফেরা ছিল দাপুটে। কিন্তু রাজনীতির নিষ্ঠুর বাস্তবতা হল, এখানে অতীতের অবদান নয়, বর্তমানের উপযোগিতাই শেষ কথা। সেই বাস্তবতারই নির্মম উদাহরণ হয়ে থাকল তাঁর পদত্যাগ। ক্ষমতার শীর্ষ থেকে হঠাৎ ছিটকে পড়া এই বিদায় আসলে এক ব্যক্তির পরাজয় নয়, বরং দলের ভেতরের শক্তি প্রদর্শনের স্পষ্ট ঘোষণা।
রবীন্দ্রনাথ ঘোষের কেরিয়ার বরাবরই টানাপোড়েনের মধ্যে দিয়ে এগিয়েছে। সংগঠনের পুরনো সৈনিক হওয়ার সুবাদে তাঁর দখলে ছিল অভিজ্ঞতা, কিন্তু একই সঙ্গে ছিল গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের বোঝা। কোচবিহারের রাজনীতিতে তিনি ছিলেন এমন এক চরিত্র, যাঁকে বাদ দিলে সমীকরণ বদলায়, আবার রেখে দিলে অস্বস্তি বাড়ে। এই দ্বিধার মাঝেই চলছিল তাঁর পথচলা। স্টল বিলি নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ সেই অস্বস্তিকে আরও প্রকাশ্য করে তোলে। অভিযোগ প্রমাণিত হোক বা না হোক, রাজনৈতিক ক্ষতিটা তখনই হয়ে গিয়েছিল।
তবুও তিনি পদ ছাড়েননি। কারণ রাজনীতিতে পদ মানে শুধু চেয়ার নয়, তা অস্তিত্বের ঢাল। সেই ঢাল নিয়েই তিনি দীর্ঘদিন দাঁড়িয়ে ছিলেন। কিন্তু যখন নির্দেশ আসে উপর থেকে, তখন সেই ঢাল মুহূর্তে ভারী হয়ে ওঠে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হস্তক্ষেপে তাঁর পদত্যাগ স্পষ্ট করে দিল, এখন দলের ভেতরে সিদ্ধান্তের কেন্দ্র কোথায়। এখানে ব্যক্তিগত ব্যাখ্যা বা আবেগের জায়গা নেই, আছে শুধু নির্দেশ আর তার বাস্তবায়ন।
এই পদত্যাগের সময়টাও গুরুত্বপূর্ণ। ভোটের আগে দল চাইছে ঝরঝরে ভাবমূর্তি, কোনও ঝুলে থাকা বিতর্ক নয়। সেই কৌশলের বলি হলেন রবীন্দ্রনাথ ঘোষ। তাঁর বিদায়ের মাধ্যমে এক ঢিলে দুই পাখি মারা হল, একদিকে বিরোধীদের আক্রমণের হাত থেকে দল খানিকটা স্বস্তি পেল, অন্যদিকে জেলা নেতৃত্বের উপর শীর্ষ নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণ আরও স্পষ্ট হল।
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, এই বিদায় কি রবীন্দ্রনাথ ঘোষের রাজনীতির শেষ? ইতিহাস বলে, তৃণমূল রাজনীতিতে শেষ বলে কিছু চূড়ান্ত নয়। আজ যিনি প্রান্তে, কাল তিনিই আবার প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে পারেন। তবে এটাও সত্য, ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে একবার সরে গেলে ফিরে আসার রাস্তা আগের মতো মসৃণ থাকে না। বিশেষ করে যখন নিজের জেলাতেই একাধিক শক্তিশালী গোষ্ঠী সক্রিয়।
এই মুহূর্তে রবীন্দ্রনাথ ঘোষ যেন রাজনীতির সুতোয় ঝুলে আছেন। সুতোটা তাঁর হাতে নেই, আছে দলের হাতে। টান পড়লে তিনি ওপরে উঠবেন, ঢিল পড়লে আরও নীচে নামবেন। তাঁর ব্যক্তিগত দক্ষতা, সংগঠনের প্রতি আনুগত্য, সবই এখন গৌণ। মুখ্য হয়ে উঠেছে দলের প্রয়োজন আর সময়ের দাবি।
কোচবিহারের রাজনীতিতে এই ঘটনা এক নতুন বার্তা ছড়িয়ে দিল। পুরনো দিনের কর্মী হওয়াই আর নিরাপত্তার গ্যারান্টি নয়। নেতৃত্বের চোখে প্রাসঙ্গিক না হলে, যে কোনও মুহূর্তে সরে যেতে হতে পারে। সেই বার্তার অভিঘাত শুধু রবীন্দ্রনাথ ঘোষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, তা ছড়িয়ে পড়বে গোটা জেলা রাজনীতিতে।
রবীন্দ্রনাথ ঘোষের পদত্যাগ এক কঠিন বাস্তবতার নাম। রাজনীতিতে কেরিয়ার কোনও সরল রেখা নয়, তা দোলনার মতো, কখনও ওপরে, কখনও নীচে। আজ তিনি নীচের দিকে, কাল কী হবে তা নির্ভর করছে সেই অদৃশ্য সুতো কার হাতে থাকবে তার উপর।
