
আইপ্যাকের অফিসে ইডি-র তল্লাশি এবং তাকে কেন্দ্র করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও রাজ্য পুলিশের সাথে কেন্দ্রীয় সংস্থার বেনজির সংঘাত এবার দেশের শীর্ষ আদালতের দরজায়। বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি মনোজ মিশ্র ও বিচারপতি বিপুল পাঞ্চোলির ডিভিশন বেঞ্চ এই মামলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশ দিয়েছে। ইডি আধিকারিকদের বিরুদ্ধে পুলিশ যে চারটি এফআইআর দায়ের করেছিল, তার ওপর আগামী ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত স্থগিতাদেশ জারি করা হয়েছে। একইসাথে লাউডন স্ট্রিট ও সল্টলেকের অফিসের সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণেরও কড়া নির্দেশ দিয়েছে আদালত।
শুনানি চলাকালীন বিচারপতি মিশ্র এক গভীর পর্যবেক্ষণ দেন। তিনি বলেন, এই মামলাটি এখন আর কেবল একটি সাধারণ তল্লাশির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা এবং রাজ্য প্রশাসনের ক্ষমতার সীমারেখা নিয়ে একটি বৃহত্তর সাংবিধানিক প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। আদালতের স্পষ্ট বার্তা— কেন্দ্রীয় সংস্থা যেমন তদন্তের নামে কোনো রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করতে পারে না, তেমনই আইনসংগত তদন্ত চলাকালীন রাজনৈতিক ঢাল ব্যবহার করে তাতে বাধা দেওয়াও অসাংবিধানিক। এই ভারসাম্য বজায় না থাকলে ‘আইনের শাসন’ ভেঙে পড়বে বলে আদালত হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
ইডির তরফে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা আদালতে দাবি করেন, তল্লাশি চলাকালীন এক চরম অরাজক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। তাঁর অভিযোগ, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্বয়ং পুলিশ আধিকারিকদের নিয়ে ঘটনাস্থলে ঢুকে ইডি আধিকারিকদের কাছ থেকে নথিপত্র এবং বাজেয়াপ্তযোগ্য ইলেকট্রনিক ডিভাইস ছিনিয়ে নিয়েছেন। ইডি বিষয়টিকে ‘চুরির সমতুল্য’ বলে বর্ণনা করেছে। এমনকি রাজ্যের ডিজিপি রাজীব কুমার এবং সাউথ ডিভিশনের ডিসিপি-র সরাসরি হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলে তাঁদের সাসপেন্ড করার দাবিও জানিয়েছে ইডি। সলিসিটর জেনারেলের দাবি, ২০৪৭ কোটি টাকার কয়লা পাচার মামলার তদন্তের সূত্র ধরেই এই তল্লাশি চালানো হয়েছিল এবং এর সাথে রাজনীতির কোনো যোগ নেই।
তৃণমূলের পক্ষে আইনজীবী কপিল সিব্বল ও অভিষেক মনু সিংভি দাবি করেন, আইপ্যাক কেবল একটি সংস্থা নয়, এটি একটি রাজনৈতিক দলের ভোটকৌশল নির্ধারণের কেন্দ্র। সিব্বলের অভিযোগ, ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের রণকৌশল সংক্রান্ত অত্যন্ত গোপনীয় তথ্য হাতিয়ে নিতেই ইডি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সেখানে হানা দিয়েছিল। তাঁদের দাবি, কোনো সিজার লিস্ট ছাড়াই ইডি সব কাজ করছিল এবং তৃণমূল নেত্রী হিসেবে সেখানে যাওয়ার পূর্ণ অধিকার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রয়েছে।
এদিন ইডির তরফে কলকাতা হাই কোর্টের পরিস্থিতি নিয়েও নালিশ জানানো হয়। তাঁদের দাবি, হাই কোর্টে শুনানি চলাকালীন হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ ছড়িয়ে ভিড় জমানো হয়েছিল এবং বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছিল। ইডির এই অভিযোগ শুনে বিচারপতি মিশ্র মন্তব্য করেন, “আদালতকে কি যন্তরমন্তর বানিয়ে ফেলেছেন?” পরিস্থিতির গুরুত্ব বিচার করেই সুপ্রিম কোর্ট মামলাটি নিজেদের পর্যবেক্ষণে রেখেছে এবং সব পক্ষকে আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে লিখিত জবাব দাখিলের নির্দেশ দিয়েছে। আপাতত সুপ্রিম কোর্টের এই নির্দেশে ইডি আধিকারিকরা আইনি স্বস্তি পেলেও, সিসিটিভি ফুটেজ এবং তদন্তের নথি নিয়ে আগামী দিনে আইনি লড়াই আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে।I
