
বাংলার বিধানসভা ভোট বা লোকসভা নির্বাচন—গত কয়েক বছরে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ময়দানে বিজেপির প্রধান রণধ্বনি ছিল ‘জয় শ্রী রাম’। কিন্তু আজকের জনসভায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কণ্ঠে সেই পরিচিত স্লোগানের বদলে শোনা গেল ‘জয় রামকৃষ্ণ’। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি সাধারণ স্লোগান বদল মনে হলেও, এর গভীরে লুকিয়ে আছে বিজেপির দীর্ঘদিনের ব্যর্থতা এবং এক নতুন রাজনৈতিক ফন্দি। প্রধানমন্ত্রীর এই ভাষণের প্রতিটি ছত্রে ছিল কৌশলী মেরুকরণের ছোঁয়া, যা বাংলার মানুষের নাড়ি বোঝার এক মরিয়া চেষ্টা। তবে প্রশ্ন হলো, বাংলার সচেতন নাগরিক সমাজ কি এই ছক ধরতে পারবে না বলে মনে হয়?
বিজেপি দীর্ঘদিন ধরেই বাংলায় ‘বহিরাগত’ তকমা ঘুচিয়ে নিজেদের ‘বাংলার দল’ হিসেবে প্রমাণ করতে চাইছে। ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগানটি উত্তর ভারতে অত্যন্ত জনপ্রিয় হলেও, বাংলায় এটি অনেক সময় উগ্রতা এবং উটকো ঝামেলার প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সম্ভবত বুঝতে পেরেছেন যে, রামের নামে বাংলায় যতটা ভোট আসার তা এসে গিয়েছে, এখন আর নতুন করে এই স্লোগান দিয়ে মানুষের মন জয় করা সম্ভব নয়। তাই এবার তিনি বাঙালির পরম শ্রদ্ধেয় শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের শরণাপন্ন হলেন। এটি আসলে এক ধরণের ‘কালচারাল অ্যাপ্রোপ্রিয়েশন’ বা অন্যের সংস্কৃতিকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করার চেষ্টা। যে দলের নীতি পরম সহিষ্ণু রামকৃষ্ণ দেবের দর্শনের সম্পূর্ণ বিপরীত, তাদের মুখে এই নাম শোনা আসলে এক বড় প্রহসন।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে বারবার বাংলার মনীষীদের নাম নিয়েছেন। কিন্তু এই নামকীর্তনের আড়ালে আসল উদ্দেশ্য ছিল রাজ্য সরকারকে আক্রমণ করা এবং ধর্মীয় সুড়সুড়ি দেওয়া। তিনি যখন ‘জয় রামকৃষ্ণ’ বলছেন, তখন তিনি আসলে বাঙালি হিন্দুদের একটি নির্দিষ্ট অংশের ধর্মীয় আবেগকে সুড়সুড়ি দিতে চাইছেন। রামকৃষ্ণ মিশনের মতো অরাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানকেও রাজনীতির অলিন্দে টেনে আনার এই যে চেষ্টা, তা অত্যন্ত বিপজ্জনক। মোদী তাঁর ভাষণে উন্নয়ন বা কর্মসংস্থানের চেয়ে বেশি জোর দিয়েছেন ভাবাবেগের ওপর। কারণ তিনি জানেন, বিগত কয়েক বছরে কেন্দ্র সরকার বাংলাকে অর্থনৈতিকভাবে যতটা বঞ্চিত করেছে, তার উত্তর উন্নয়ন দিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। তাই সংস্কৃতির এই মেকি আবরণই এখন তাঁর শেষ ভরসা।
শ্রী রামকৃষ্ণের মূল বাণী ছিল ‘যত মত তত পথ’। তিনি সকল ধর্মের সরমর্মকেই সম্মান করতে শিখিয়েছিলেন। অন্যদিকে, মোদীর দল যে রাজনীতির চর্চা করে, তার ভিত্তিই হলো বিভাজন এবং একদেশদর্শিতা। যে আদর্শে ভিন্নমতের কোনো স্থান নেই, সেই আদর্শের ধারক-বাহকরা যখন রামকৃষ্ণের জয়ধ্বনি দেন, তখন তা স্ববিরোধী শোনায়। প্রধানমন্ত্রীর পুরো ভাষণে কোথাও এই উদারতার প্রতিফলন ছিল না; বরং ছিল বিরোধীদের প্রতি তীব্র কটাক্ষ এবং আক্রমণাত্মক মেজাজ। স্লোগান বদলে রামকৃষ্ণ এলেও, বিজেপির রাজনৈতিক চরিত্র যে বদলায়নি, তা মোদীর রণদেহী ভাষণেই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে।
বাংলার রাজনীতিতে চিঁড়ে ভিজতে গেলে শুধু স্লোগান বদলালে চলে না, মানুষের বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে হয়। বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙা থেকে শুরু করে বিশ্বভারতীর ঐতিহ্য নিয়ে টানাটানি—বাঙালির মনে বিজেপির প্রতি যে সংশয় তৈরি হয়েছে, তা স্রেফ ‘জয় রামকৃষ্ণ’ বলে মুছে ফেলা যাবে না। বাংলার মানুষ রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দকে হৃদয়ে বসিয়ে পুজো করে, তাঁদের ছবির ওপর রাজনৈতিক ঝাণ্ডা দেখতে তারা অভ্যস্ত নয়। মোদীর এই ভাষণ তাই হিতে বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। সাধারণ মানুষ আজ প্রশ্ন তুলছেন—যাঁরা দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি কমাতে পারেন না, যাঁরা বেকারত্ব ঘোচাতে ব্যর্থ, তাঁরা হঠাৎ ঠাকুরের নাম জপ করছেন কেন? উত্তরটা পরিষ্কার—ভোটের সময় ভগবানের নাম নেওয়া বিজেপির পুরনো অভ্যাস। পরিশেষে বলা যায়, মোদীর এই নয়া স্লোগান আসলে তাঁর দলের রণকৌশলের এক বড়সড় পরিবর্তন বা ইউ-টার্ন। ‘রাম’ থেকে ‘রামকৃষ্ণ’—এই যাত্রা আসলে প্রমাণ করে যে, বিজেপি বাংলায় কোণঠাসা। আধ্যাত্মিকতার মোড়কে এই রাজনৈতিক অনুপ্রবেশ বাংলার সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষ ভালোভাবে নেবে না। ঠাকুর শ্রী রামকৃষ্ণের নাম নিয়ে ভোটের বৈতরণী পার হওয়ার এই যে অপচেষ্টা, তা বাংলার সচেতন ভোটারদের কাছে কেবল একটি কৌতুক হিসেবেই থেকে যাবে। রাজনীতির ময়দানে ভক্তি নয়, শেষ কথা বলবে যুক্তি আর উন্নয়ন—যা মোদীর ভাষণে বরাবরের মতোই অনুপস্থিত ছিল।।
