
বাংলার রাজনীতির ইতিহাসে সিঙ্গুর কেবল একটি জনপদ নয়, বরং এক বিরাট রাজনৈতিক উথাল-পাথালের প্রেক্ষাগৃহ। সেই সিঙ্গুর আবারও শিরোনামে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরের রেশ কাটতে না কাটতেই আগামী ২৮ জানুয়ারি সেখানে সভা করতে যাচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। যে সিঙ্গুরকে সিঁড়ি বানিয়ে ২০১১ সালে বাম সাম্রাজ্যের পতন ঘটিয়ে রাইটার্স বিল্ডিংসের দখল নিয়েছিলেন মমতা, পনেরো বছর পর ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের মুখে দাঁড়িয়ে আবারও সেই একই মাটিকে কেন ‘পাখির চোখ’ করতে হচ্ছে তাঁকে? এই প্রশ্নটাই এখন বাংলার সচেতন নাগরিক সমাজের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে।
রোববার সিঙ্গুরে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি শিল্প নিয়ে একটি শব্দও খরচ না করায় বঙ্গ বিজেপির অন্দরমহলে যখন অস্বস্তি তুঙ্গে, ঠিক সেই ফাঁক দিয়েই নিজের পুরনো জমি ফিরে পেতে মরিয়া তৃণমূল নেত্রী। ঘোষণা হয়েছে, সেই সভা থেকে ‘বাংলার বাড়ি’ প্রকল্পের কিস্তি দেওয়া হবে এবং সিঙ্গুরে ৫০০ কোটি টাকার বিনিয়োগের কথা বলা হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ২০১১ থেকে ২০২৬— এই সুদীর্ঘ পনেরো বছরে রাজ্যের শাসনভার হাতে থাকার পর কেন আবারও ভোটের ঠিক আগেই সিঙ্গুরকে উন্নয়নের পোস্টার বয় হিসেবে সাজাতে হচ্ছে?
এক সময় কৃষকের জমি রক্ষার স্লোগান তুলে টাটাদের ন্যানো কারখানা তাড়িয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর সেই জেদ তাঁকে ক্ষমতায় এনেছিল ঠিকই, কিন্তু বাংলার ললাটে সেঁটে দিয়েছিল ‘শিল্পবিরোধী’ তকমা। কৃষকরা জমি ফিরে পেয়েছেন ঠিকই, কিন্তু সেই জমিতে আজও সোনার ফসল ফলে না। পনেরো বছর ধরে সিঙ্গুরের চাষিদের হাতে ‘খয়রাতি’ চাল আর অর্থ তুলে দিয়ে আসলে তাঁদের পরনির্ভরশীল করে রাখা হয়েছে। যে যুবকরা কারখানায় কাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন, আজ তাঁরা ভিনরাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিক। আজ যদি ৫০০ কোটি টাকার বিনিয়োগের কথা বলতে হয়, তবে গত পনেরো বছরে নবান্ন কী করছিল? কেন বারবার ভোটের হাওয়া গরম হতেই নবান্ন বা কেন্দ্রের দিল্লিওয়ালাদের সিঙ্গুরের কথা মনে পড়ে?
বাস্তবটা হলো, সাধারণ মানুষ বা প্রান্তিক কৃষকরা সব রাজনৈতিক দলের কাছেই কেবল দাবার ঘুঁটি। বিরোধী নেত্রী থাকাকালীন মমতা যেভাবে সিঙ্গুরকে ‘আন্দোলনের প্রতীক’ করেছিলেন, মুখ্যমন্ত্রী হিসেবেও তিনি তাকে ‘ভোটের হাতিয়ার’ হিসেবেই ব্যবহার করে চলেছেন। শিল্পের দোহাই দিয়ে হোক বা প্রকল্পের টাকা বিলি করে— লক্ষ্যটা আসলে উন্নয়ন নয়, বরং গদি রক্ষা। আজ শিল্প নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর নীরবতা যেমন রহস্যময়, তেমনি মুখ্যমন্ত্রীর হঠাৎ সিঙ্গুর-প্রীতিও সমানভাবে সুবিধাবাদী রাজনীতির নামান্তর।
যদি সিঙ্গুরের মাটিতে সত্যিই শিল্পায়ন সম্ভব হতো, তবে দীর্ঘ দেড় দশকে সেখানে একটি ছোট কারখানা পর্যন্ত কেন গড়ে উঠল না? কেন আজ বিনিয়োগের সিন্দুকে মরচে পড়ার পর নতুন করে ৫০০ কোটির গল্প শোনাতে হচ্ছে? আসলে আমাদের রাজ্যের রাজনীতি আবেগ আর প্রতীকের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে ধারাবাহিক উন্নয়নের দায় নেওয়ার সাহস কোনো পক্ষই দেখায় না। কৃষকের পেটে ভাত জুটল কি না, তার চেয়ে রাজনৈতিক নেতাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো ভোটের বাক্সে কতগুলো বোতাম তাঁদের দিকে পড়ল। সিঙ্গুরের সেই বিতর্কিত জমি আজও বাংলার রাজনীতির নির্লজ্জ দড়িটানাটানির সাক্ষী। ২০২৬ সালের নির্বাচন যত এগিয়ে আসবে, ততই এই মাটিকে ঘিরে আরও প্রতিশ্রুতি, আরও বড় ঘোষণা আসবে। কিন্তু সিঙ্গুরের মানুষ জানেন, এই পনেরো বছরে চেনা চকের বাইরে কোনো নতুন দিশা মেলেনি। শেষ পর্যন্ত সিঙ্গুর কি শুধুই রাজনীতির স্বার্থ রক্ষার পথ হয়েই থেকে যাবে? না কি কখনও প্রকৃত অর্থেই সেখানে ধোঁয়া উঠবে কারখানার চিমনি থেকে? উত্তরটা হয়তো আজও সেই অনুচ্চারিত কান্নার মধ্যেই লুকিয়ে আছে, যা শোনার মতো সময় বা সদিচ্ছা কোনো শাসকেরই নেই।।
