
নীলাঞ্জন দাশগুপ্ত
শীতের শেষ রোদ গায়ে মেখে যখন বাসন্তী রঙ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, তখন মনটাও অকারণেই হালকা হয়ে যায়। হলুদ শাড়ি, হলুদ পাঞ্জাবি, চুলে গাঁদাফুল, হাতে বই, সব মিলিয়ে যেন চারপাশটা শুধু পুজোর নয়, ভালো লাগার রঙে রঙিন হয়ে ওঠে। এই একটা দিনে বাঙালির বুকের ভেতরে জমে থাকা না বলা কথা, না বলা অনুভূতিগুলো একটু করে সাহস পায় বাইরে বেরোবার।বাঙালির কাছে সরস্বতী পুজো মানে শুধু বিদ্যার দেবীর আরাধনা নয়, এটা যেন ভালোবাসার এক নরম উৎসব।
স্কুল-কলেজের দিনগুলোতে সরস্বতী পুজো মানেই একটা অন্যরকম উত্তেজনা। ক্লাসরুমের বেঞ্চে বসে পড়ার চেয়ে মনটা তখন বেশি ব্যস্ত থাকে কার দিকে তাকানো যাবে, কার পাশে গিয়ে দাঁড়ানো যাবে, কে আজ হলুদ রঙে সবচেয়ে সুন্দর লাগছে এইসব নিয়ে। বন্ধুদের ভিড়ের মধ্যেও চোখ খুঁজে ফেরে একটা নির্দিষ্ট মুখ। একটু চোখাচোখি হলেই বুকের ভেতর কেমন যেন কেঁপে ওঠে। মনে হয়, এই মুহূর্তটা যদি একটু বেশিক্ষণ থাকত।
পুজোর মণ্ডপে ঢুকতে ঢুকতে হালকা করে হাতটা ছুঁয়ে যাওয়া, প্রসাদের লাইনে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা, ভোগের প্লেট হাতে নিয়ে চুপচাপ একে অন্যের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলা এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোর মধ্যেই লুকিয়ে থাকে সরস্বতী পুজোর প্রেম। এখানে প্রেমটা খুব বড় করে ঘোষণা করা নয়, খুব নাটকীয়ও নয়। এখানে প্রেমটা লাজুক, একটু কাঁচা, একটু ভীতু, আবার ভীষণ মিষ্টি। একটা চিরকুট, একটা ছোট্ট ফুল, একটা নিরীহ হাসি, এইটুকুতেই যেন পুরো পৃথিবীটা সুন্দর হয়ে যায়।
এই দিনে অনেকের জীবনে প্রথম প্রেমটা ধরা দেয়। কারও হাত প্রথমবার ধরা হয়, কারও চোখে প্রথমবার ধরা পড়ে নিজের জন্য বিশেষ হয়ে ওঠা সেই দৃষ্টি। হয়তো কেউ সাহস করে বলে ফেলে মনের কথা, হয়তো কেউ শুধু মনে মনে ভালোবাসে, কিন্তু কাউকে কিছু বলে না। তবু সেই না বলা ভালোবাসাটাও অসম্ভব দামী হয়ে থাকে। কারণ এই ভালোবাসার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে কৈশোরের সরলতা, জীবনের সবচেয়ে নিষ্পাপ অনুভূতিগুলো।
বছরের পর বছর কেটে যায়, মানুষ বড় হয়, দায়িত্ব বাড়ে, জীবন কঠিন হয়। কিন্তু সরস্বতী পুজোর কথা এলেই মনটা আবার ফিরে যায় সেই স্কুলের করিডোরে, কলেজের ক্যাম্পাসে, বন্ধুরা মিলে হইহই করা সেই দিনে। মনে পড়ে যায় কারও সঙ্গে তোলা একটা ঝাপসা ছবি, কারও দেওয়া একটা ছোট উপহার, কিংবা কারও সঙ্গে কাটানো কয়েকটা চুপচাপ মুহূর্ত। হয়তো সেই মানুষটা আজ জীবনে নেই, তবু স্মৃতির ভেতরে সে আজও বাসন্তী রঙের মতো উজ্জ্বল।
এই প্রেমে কোনও তাড়াহুড়ো নেই, কোনও শর্ত নেই। এখানে ভালোবাসা মানে পাশে থাকা, একে অন্যের জন্য একটু বেশি খেয়াল রাখা, চোখের ভাষায় অনেক কিছু বলে ফেলা। সরস্বতী পুজোর প্রেম মানে শুধু রোম্যান্স নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বন্ধুত্ব, নির্ভরতা, আর একটা মিষ্টি নিরাপত্তার অনুভূতি। মনে হয়, এই একটা দিনেই মনটা নিজের মতো করে নিঃশ্বাস নিতে পারে।
তাই বাঙালির কাছে সরস্বতী পুজো আসলে নিজের ভ্যালেন্টাইনস ডে। কোনও বিদেশি তারিখের দরকার হয় না, কোনও লাল গোলাপের বাধ্যবাধকতা নেই। এখানে ভালোবাসা হলুদ রঙের, বসন্তের রোদের মতো উষ্ণ, ঢাকের তালে তালে নরম হয়ে ওঠা। সরস্বতী পুজোর মণ্ডপে, প্রসাদের গন্ধে, হাসি-ঠাট্টার ভিড়ে, এইসবের মধ্যেই বাঙালির প্রেম ধীরে ধীরে বড় হয়, নীরবে গভীর হয়, আর সারাজীবনের জন্য মনে থেকে যায়।
