
তিনি এমন এক নাম, যাঁকে উচ্চারণ করলে কেবল ইতিহাস নয়, মেরুদণ্ড সোজা হয়ে দাঁড়ায়। একটি মানুষের জীবন কীভাবে একটি জাতির সাহস হয়ে উঠতে পারে, তার সবচেয়ে জ্বলন্ত উদাহরণ তিনি। তাঁর উপস্থিতি মানেই ছিল স্থিরতা ভাঙা, ভয়ের ভিত নড়িয়ে দেওয়া, আর আপসহীন মনোভাব নিয়ে শাসনের চোখে চোখ রেখে কথা বলা। তিনি ছিলেন এমন এক আগুন, যে আগুন কেবল জ্বালায়নি, পোড়ায়নি শুধু, সে আগুন আলোও দিয়েছে, পথও দেখিয়েছে, আর সাহসের মানচিত্র এঁকে দিয়েছে লক্ষ লক্ষ মানুষের মনে। তিনি সুভাষ, বাংলার সন্তান ভারত মায়ের সন্তান সুভাষচন্দ্র বসু।
যেখানে অনেকেই নিরাপদ পথ খুঁজে নেন, সুভাষ সেখানেই ঝুঁকির রাস্তা বেছে নিয়েছিলেন। কারণ তাঁর কাছে স্বাধীনতা ছিল কোনো আলংকারিক শব্দ নয়, কোনো সভার মঞ্চে বলা আবেগী বাক্যও নয়। স্বাধীনতা ছিল শ্বাস-প্রশ্বাসের মতো জরুরি, রক্তের মতো অবিচ্ছেদ্য। তাই তিনি জানতেন, শিকল ভাঙতে গেলে হাত কেটে রক্ত ঝরতে পারে, কিন্তু সেই রক্তই একদিন পথের দাগ হয়ে দাঁড়াবে, যেখানে হেঁটে যাবে পরবর্তী প্রজন্ম।
তিনি কেবল নেতা ছিলেন না, ছিলেন বিদ্রোহের মানসিকতা। তাঁর বিদ্রোহ ছিল পরিকল্পিত, শৃঙ্খলাবদ্ধ, আর ভয়ংকরভাবে স্পষ্ট। তিনি জানতেন, আবেগ দিয়ে আগুন জ্বালানো যায়, কিন্তু সংগঠন ছাড়া সেই আগুন বেশিক্ষণ টেকে না। তাই তাঁর বিদ্রোহে ছিল শাসনব্যবস্থার বিপরীতে দাঁড়ানো এক নতুন শৃঙ্খলা, যেখানে দায়িত্ব, আত্মত্যাগ আর লড়াই, সব এক সুতোয় গাঁথা। তাঁর কাছে দেশপ্রেম মানে ছিল ঘরে বসে আবেগে ভাসা নয়, বরং ঘর ছাড়ার সাহস, পরিচিত নিরাপত্তা ছেড়ে অচেনা ঝুঁকির দিকে এগিয়ে যাওয়া।
সুভাষচন্দ্র ছিলেন এমন এক মানুষ, যিনি পরাধীনতার ভাষা বুঝতেন, কিন্তু সেই ভাষায় কথা বলতে রাজি ছিলেন না। তাঁর কণ্ঠে ছিল চ্যালেঞ্জ, চোখে ছিল অনড় সিদ্ধান্ত, আর চলনে ছিল এমন দৃঢ়তা, যা দেখে শাসকেরাও বুঝত, এই মানুষটিকে সহজে থামানো যাবে না। তাঁর পথচলায় ছিল একধরনের নীরব ঘোষণা, ভয় পেলে হার, আর ভয়কে জয় করলে ইতিহাস তৈরি হয়।
তাঁর বিদ্রোহের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল আত্মসম্মান। তিনি বিশ্বাস করতেন, যে জাতি নিজের মর্যাদায় আঘাত সহ্য করে, সে জাতি ধীরে ধীরে নিজের অস্তিত্বও হারায়। তাই তাঁর লড়াই কেবল বাইরের শাসনের বিরুদ্ধে ছিল না, ছিল ভেতরের আত্মসমর্পণের বিরুদ্ধেও। তিনি মানুষকে শেখাতে চেয়েছিলেন, নিজেকে ছোট ভাবা মানেই শাসকের সবচেয়ে বড় জয়। আর নিজেকে শক্ত করে দাঁড় করানো মানেই শিকলের প্রথম ফাটল।
তিনি ছিলেন ঝড়ের মতো, ঝড়ের আগে যেমন বাতাস থমকে যায়, তেমনই তাঁর আগমনের আগে ইতিহাসের পাতা যেন একটু থমকে গিয়েছিল। তারপর সেই ঝড় এসে সবকিছু নড়িয়ে দিয়েছিল। পুরোনো ভয়, পুরোনো হিসাব, পুরোনো আপস সব কিছু ওলটপালট করে দিয়েছিল তাঁর উপস্থিতি। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, একজন মানুষ চাইলে শুধু নিজের জীবন নয়, একটি জাতির আত্মবিশ্বাসের দিকও বদলে দিতে পারে।
আজও তাঁর নাম মানেই একটি প্রশ্ন, আমরা কি এখনও সাহসী? আমরা কি এখনও অন্যায়ের সামনে নীরব থাকি, না কি বুক চিতিয়ে দাঁড়াই? তিনি যেন সময়ের কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছেন, চোখে সেই পুরোনো আগুন, যেন বলছেন, লড়াই কখনও শেষ হয় না, শুধু রূপ বদলায়। আর সেই রূপ বদলালেও, সাহসের ভাষা বদলায় না। তাঁর উত্তরাধিকার কোনো জাদুঘরে বন্দি নয়; তা বেঁচে আছে প্রতিটি মাথা উঁচু করে হাঁটা মানুষের ভেতরে, প্রতিটি না-মানা সিদ্ধান্তের মধ্যে, প্রতিটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মুহূর্তে। তিনি ইতিহাস নন, তিনি এখনো এক চলমান বিদ্রোহ।
