
ভয়াবহ তুষারঝড়ের তাণ্ডব কাটিয়ে যখন স্বাভাবিক ছন্দে ফেরার লড়াই চালাচ্ছে আমেরিকার মানুষ, ঠিক তখনই নতুন এক প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ভ্রুকুটি। দেশটির বিস্তীর্ণ অংশে এবার ত্রাস সৃষ্টি করছে ‘বম্ব সাইক্লোন’ বা ‘সাইক্লোন বোমা’। আবহাওয়া দপ্তরের সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, আজ ৩০ জানুয়ারি থেকেই আমেরিকার দক্ষিণ-পূর্ব অংশে এই শক্তিশালী ঝড়ের প্রভাব শুরু হতে পারে। আগামীকাল ৩১ জানুয়ারি নাগাদ এটি আরও ভয়ংকর রূপ নিয়ে পূর্ব উপকূল জুড়ে আছড়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে ইতিমধ্যেই ক্যারোলাইনা থেকে শুরু করে নিউ ইংল্যান্ড পর্যন্ত এলাকায় রেড অ্যালার্ট বা সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে প্রশাসন।
আবহাওয়াবিদদের মতে, এই দুর্যোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে নর্থ ক্যারোলাইনা এবং ভার্জিনিয়া। বিশেষ করে ভার্জিনিয়া, নরফক এবং র্যালে শহরে ৬ থেকে ১২ ইঞ্চি পর্যন্ত ভারী তুষারপাত হতে পারে। এর সঙ্গে যোগ হবে প্রবল গতির ঝোড়ো হাওয়া। উপকূলীয় নীচু এলাকাগুলোতে ভারী বৃষ্টির কারণে বন্যার আশঙ্কা করা হচ্ছে, অন্যদিকে পাহাড়ি অঞ্চলে তুষারপাত ও শৈত্যপ্রবাহ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে।
পূর্বাভাস বলছে, রবিবারের মধ্যে এই ঝড় উত্তর দিকে অগ্রসর হয়ে নিউ ইয়র্ক, বস্টন এবং ফিলাডেলফিয়ার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোতে আঘাত হানবে। আগের তুষারঝড়ে যারা বিদ্যুৎহীন অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন বা যাদের রাস্তাঘাট এখনো বরফে ঢাকা, তাদের জন্য এই নতুন সাইক্লোন মরার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক জায়গায় তুষারঝড় বা ‘ব্লিজার্ড’ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যেখানে দৃশ্যমানতা প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে।
আবহবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘বম্বোজেনেসিস’। এটি মূলত শীতকালীন এক শক্তিশালী ঝড়, যা অত্যন্ত দ্রুত গতিতে শক্তি সঞ্চয় করে। যখন সমুদ্রের উষ্ণ ও আর্দ্র বাতাসের সঙ্গে হঠাৎ করে মেরু অঞ্চলের হাড়কাঁপানো ঠান্ডা বাতাস মিশে যায়, তখন বায়ুচাপ নাটকীয়ভাবে (২৪ ঘণ্টায় অন্তত ২৪ মিলিবার) কমে যায়। এই দ্রুত পরিবর্তনের ফলে ঝড়টি অনেকটা বিস্ফোরণের মতো বা বোমার মতো তীব্রতা নিয়ে আছড়ে পড়ে, তাই এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘সাইক্লোন বোমা’। বিশেষজ্ঞরা একে ‘শীতকালীন হারিকেন’-ও বলে থাকেন, কারণ এর বাতাসের গতিবেগ অনেক সময় ঘূর্ণিঝড়ের সমান হয়ে দাঁড়ায় এবং এটি বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে ধ্বংসলীলা চালাতে পারে।
ইতিমধ্যেই স্থানীয় প্রশাসন থেকে সাধারণ মানুষকে অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত এড়িয়ে চলার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, ঝোড়ো হাওয়ার কারণে গাছ উপড়ে পড়া এবং বৈদ্যুতিক খুঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটতে পারে। তাই নাগরিকদের শুকনো খাবার, প্রয়োজনীয় ওষুধ, পাওয়ার ব্যাংক এবং মোমবাতি মজুত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিপদগ্রস্ত অঞ্চলগুলোর স্কুল-কলেজ ও অফিসগুলোতে আগাম ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। শত শত ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে এবং অনেক জায়গায় ট্রেন ও বাস চলাচল সীমিত করা হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে রাস্তা পরিষ্কার করার জন্য ‘স্নো প্লাউ’ মেশিনগুলো প্রস্তুত রাখা হয়েছে, তবে ঝড়ের সময় রাস্তায় থাকা প্রাণঘাতী হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে। প্রকৃতির এই রুদ্ররূপের সামনে এখন চরম উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছেন লাখ লাখ আমেরিকাবাসী। গত কয়েক দিনের হাড়কাঁপানো ঠান্ডার পর এই ‘সাইক্লোন বোমা’ ঠিক কতটা ক্ষয়ক্ষতি ডেকে আনে, এখন সেটাই দেখার।।
