
জম্মু ও কাশ্মীরের আন্তর্জাতিক সীমান্ত এবং নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর বিগত কয়েক সপ্তাহ ধরে পাকিস্তানি ড্রোনের সন্দেহজনক আনাগোনা এক চরম উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে। ২০২৬ সালের শুরু থেকেই সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে এই ড্রোনের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে সাম্বা জেলা এবং উত্তর কাশ্মীরের কেরান সেক্টরে ড্রোনের আনাগোনা জওয়ানদের তৎপরতা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। সাম্প্রতিক এক ঘটনায় সাম্বা জেলার আন্তর্জাতিক সীমান্তের কাছে প্রায় পাঁচ মিনিট ধরে একটি ড্রোন ভাসমান অবস্থায় ছিল। শনিবার সকালে বিএসএফ জওয়ানদের নজরে আসামাত্রই তারা ড্রোনটি লক্ষ্য করে গুলি চালান। যদিও গুলি চলার পর ড্রোনটি আর দেখা যায়নি এবং সেটি ভূপাতিত হয়েছে কি না তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি, তবুও বিষয়টি নিয়ে পুরো এলাকায় ব্যাপক তল্লাশি অভিযান শুরু হয়েছে। প্রায় একই সময়ে কেরান সেক্টরের যোধা মাকান বিরান্দোরি এলাকাতেও পাকিস্তান থেকে আসা ড্রোন আকাশসীমায় ঢুকে পড়ে এবং ভারতীয় সেনার কড়া প্রতিরোধের মুখে ফিরে যেতে বাধ্য হয়।
নিরাপত্তা বাহিনীর দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা বলছে যে, পাকিস্তান এই ড্রোনগুলোকে মূলত নজরদারি চালানো, অস্ত্র ও মাদক পাচার এবং জঙ্গিদের অনুপ্রবেশে সহায়তা করার জন্য ব্যবহার করে। গত ১৫ জানুয়ারি সাম্বায় একই ধরনের ঘটনা ঘটেছিল এবং এমনকি প্রজাতন্ত্র দিবসের আগের দিনও উপত্যকার আকাশে ড্রোনের আনাগোনা ভাবিয়ে তুলেছিল কর্মকর্তাদের। ছোট আকৃতির এই ড্রোনগুলো নিচু উচ্চতায় ও দ্রুত গতিতে উড়তে সক্ষম হওয়ায় সাধারণ নজরদারিতে এগুলোকে ধরা কঠিন। পাকিস্তান এখন নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি শাহপার-২ এবং শাহপার-৩ ড্রোনের পাশাপাশি তুরস্কের তৈরি বিখ্যাত বয়রক্তর বিটি-২ ড্রোন ব্যবহার করছে। এই আধুনিক প্রযুক্তির ড্রোনগুলো মূলত হামলার কাজে বা স্পর্শকাতর এলাকার তথ্য সংগ্রহের জন্য মোতায়েন করা হয়। চলতি বছরের প্রথম ২০ দিনেই অন্তত পাঁচবার এমন অনুপ্রবেশের ঘটনা নিরাপত্তাবাহিনীকে ভাবিয়ে তুলেছে।
এই পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে ভারতীয় সেনাপ্রধান জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদী কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছেন যে, এ ধরনের উস্কানিমূলক কার্যকলাপ ভারত কখনোই বরদাস্ত করবে না। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় ভারত ও পাকিস্তানের ডিরেক্টর জেনারেল অফ মিলিটারি অপারেশনস পর্যায়েও আলোচনা হয়েছে। সীমান্তের সুরক্ষা ব্যবস্থা আধুনিকীকরণ করতে ভারতীয় সেনাবাহিনী এখন আকাশ নজরদারি জোরদার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সীমান্ত জুড়ে একাধিক এয়ার কম্যান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টার গড়ে তোলার কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। এই কেন্দ্রগুলো ৩৫ কিলোমিটার দূর থেকেই যেকোনো সন্দেহজনক উড়ন্ত বস্তু শনাক্ত করতে পারবে এবং ৩ কিলোমিটার উচ্চতা পর্যন্ত নজরদারি চালাতে সক্ষম হবে। যদি সীমান্তের ভেতরে কোনো অচেনা ড্রোন ঢুকে পড়ে, তবে এই কন্ট্রোল সেন্টারগুলো তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিষ্ক্রিয় করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখবে।
সেনাবাহিনীর এই নতুন প্রতিরক্ষা কৌশলের আওতায় শুধু নজরদারি নয়, বরং পালটা আক্রমণের সক্ষমতাও বহুগুণ বাড়ানো হচ্ছে। পশ্চিমাঞ্চলীয় থিয়েটারে ১০ হাজার এবং প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখার প্রায় ৩৪৮৮ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে ২০ হাজারেরও বেশি ড্রোন মোতায়েন করার পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি সীমান্তে দুটি রকেট ফোর্স ইউনিট, দুটি রুদ্র ব্রিগেড এবং ২১টি ভৈরব ব্যাটালিয়ন মোতায়েন করে শক্তি বৃদ্ধি করা হয়েছে। ভারতীয় আর্টিলারির পাল্লা ১৫০ কিলোমিটার থেকে বাড়িয়ে ১০০০ কিলোমিটার পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়েছে, যাতে দূরপাল্লার লক্ষ্যবস্তুতেও নিখুঁত আঘাত হানা সম্ভব হয়। আধুনিক সেন্সর, রাডার এবং ড্রোনবিরোধী প্রযুক্তির এই সমন্বিত প্রয়োগ সীমান্তের প্রতিটি ইঞ্চিকে সুরক্ষিত রাখবে। প্রতিটি সন্দেহজনক গতিবিধিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে এবং তদন্তের অগ্রগতি অনুযায়ী নিয়মিত তথ্য সরবরাহ করছে সেনাবাহিনী। বর্তমানে সীমান্ত এলাকায় সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর এই নতুন নিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যকর হলে ড্রোনের মাধ্যমে অনুপ্রবেশ বা পাচারের চেষ্টা পুরোপুরি রুখে দেওয়া সম্ভব হবে বলে মনে করছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রক।।
