
কেন্দ্রীয় বাজেট পেশ হওয়ার পর থেকেই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে বাংলার রাজনৈতিক ময়দান। একদিকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই বাজেটকে “দিশাহীন” বলে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন, অন্যদিকে বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য পাল্টা কটাক্ষ ছুড়ে দিয়ে দাবি করেছেন, ২০২৬-এর নির্বাচনে তৃণমূলের “বিসর্জন” এখন সময়ের অপেক্ষা। বাজেটের আর্থিক বরাদ্দকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই সংঘাত এখন চরম রাজনৈতিক তরজায় রূপ নিয়েছে।
বাজেট পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বরাবরের মতোই কেন্দ্রের বিরুদ্ধে বঞ্চনার অভিযোগ তুলেছেন। তাঁর দাবি, এই বাজেট সাধারণ মানুষের জন্য নয়, বরং জনবিচ্ছিন্ন। মমতা বলেন, “কেন্দ্রীয় সরকার বুঝতে পেরেছে যে তারা বাংলায় আর ভোট পাবে না, তাই সচেতনভাবে বাংলাকে বঞ্চনা করা হয়েছে। এই বাজেটের কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য বা দিশা নেই।” তিনি আরও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, বিজেপি আসন্ন নির্বাচনে বাংলায় পুরোপুরি পর্যুদস্ত হবে। “They will lose Bengal”—মুখ্যমন্ত্রীর এই মন্তব্য রাজনৈতিক মহলে বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।
মুখ্যমন্ত্রীর এই আক্রমণের জবাবে পাল্টা মেজাজে ধরা দেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি বিদ্রুপের সুরে বলেন, “বাংলা তো দিদিরই ছিল, তাঁরই স্লোগান ছিল ‘আমার বাংলা’। কিন্তু এখন শয়নে-স্বপনে, নিদ্রায়-জাগরণে তিনি বুঝে গেছেন যে বাংলায় তাঁর সময় ফুরিয়ে এসেছে। এখন তাঁর মনে মনে ধ্বনিত হচ্ছে ‘বিদায় বাংলা’।”
শমীক ভট্টাচার্য দাবি করেন, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন হবে তৃণমূল সরকারের বিসর্জনের পালা। তাঁর মতে, কেন্দ্রীয় বাজেট জনমুখী এবং উন্নয়নমুখী হওয়া সত্ত্বেও রাজনৈতিক স্বার্থে মুখ্যমন্ত্রী মানুষকে বিভ্রান্ত করছেন। “কালের দেওয়াল লিখন কেউ বদলাতে পারবে না,”—এই মন্তব্য করে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে রাজ্যে পরিবর্তন এখন অনিবার্য।
বাজেটকে কেন্দ্র করে এই শাসক-বিরোধী লড়াই আসলে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের মহড়া। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাজেটের “বঞ্চনা” ইস্যুকে হাতিয়ার করে বাঙালি আবেগকে উসকে দিয়ে ভোটব্যাঙ্ক সংহত করতে চাইছেন। অন্যদিকে, বিজেপি কেন্দ্রীয় প্রকল্পের খতিয়ান এবং শুভেন্দু অধিকারীর উল্লিখিত ‘শিলিগুড়ি বুলেট ট্রেন’ বা ‘শিল্প করিডর’-এর মতো বিষয়গুলো সামনে রেখে উন্নয়নের বিকল্প মডেল পেশ করছে।
শুভেন্দু অধিকারী যেখানে বাজেটকে বাংলার জন্য “উপহার” বলছেন, সেখানে শমীক ভট্টাচার্যের সুর আরও এক ধাপ চড়া। তিনি তৃণমূলকে রাজনৈতিকভাবে বিসর্জন দেওয়ার ডাক দিয়ে স্পষ্ট করে দিলেন যে, আগামী দিনে প্রচারের অভিমুখ কেবল বাজেটের সংখ্যাতত্ত্বে আটকে থাকবে না, বরং তা সরাসরি ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে পরিণত হবে।
কেন্দ্রীয় বাজেটকে কেন্দ্র করে এই রাজনৈতিক বাকযুদ্ধ প্রমাণ করছে যে, ২০২৬-এর নির্বাচন রাজ্যের রাজনীতির জন্য একটি সন্ধিক্ষণ হতে চলেছে। একদিকে মুখ্যমন্ত্রীর “বঞ্চনার” অভিযোগ আর অন্যদিকে বিজেপির “বিদায় ঘণ্টা” বাজার দাবি—এই দুই বিপরীতমুখী মেরুকরণে শেষ পর্যন্ত কার পাল্লা ভারী হয়, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। বাংলার সাধারণ মানুষ কি বাজেটের উপহারের ওপর ভরসা করবেন, নাকি বঞ্চনার অভিযোগে ফের তৃণমূলের পাশে দাঁড়াবেন, তার উত্তর দেবে সময়।।
