
“নীল আকাশের মিতালি যেখানে সবুজ পাহাড়ের সাথে,কুয়াশা এসে গল্প বুনে যায় তোমার-আমার হাতে।চায়ের দেশের গন্ধে মাখা মায়াবী এক ভোর, মুন্নার যেন হিয়াতে লাগায় ভালোবাসার ঘোর।”
কল্পনা করুন, আপনি একটি পাহাড়ি বাঁকের মুখে দাঁড়িয়ে আছেন। চোখের সামনে দিগন্ত বিস্তৃত মখমলের মতো নরম সবুজ গালিচা, যা আসলে পাহাড়ের ঢালে সাজানো সারি সারি চা বাগান। ভোরের প্রথম আলো যখন সেই সবুজের বুকে এসে পড়ে, তখন শিশিরবিন্দুগুলো মুক্তোর মতো জ্বলজ্বল করে ওঠে। এক পাশ থেকে একঝাঁক সাদা মেঘ অলস ভঙ্গিতে ভেসে এসে আপনাকে জাপ্টে ধরছে, আর নাকে আসছে সতেজ চায়ের মাদকতাময় সুবাস। পাহাড়ের গায়ে পাক খাওয়া সরু রাস্তাগুলো যেন কোথাও গিয়ে মেঘের আড়ালে হারিয়ে গেছে। এটাই মুন্নার—কেরালার ইডুক্কি জেলায় অবস্থিত এক মায়াবী শৈল শহর, যেখানে প্রকৃতি তার সবটুকু সৌন্দর্য উজাড় করে দিয়েছে।
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৬০০ মিটার উচ্চতায় মুথিরাপুরা, নল্লাথান্নি ও কুন্ডালা—এই তিনটি নদীর মিলনস্থলে গড়ে ওঠা মুন্নার এক সময় ছিল ব্রিটিশদের প্রিয় গ্রীষ্মকালীন আবাস। আজও এখানকার প্রতিটি স্থাপত্যে ও চা বাগানে সেই ঔপনিবেশিক আভিজাত্য মিশে আছে। মুন্নারকে বলা হয় ‘নীল পাহাড়ের দেশ’। এর রহস্য লুকিয়ে আছে ‘নীলাকুরিঞ্জি’ নামক এক অদ্ভুত ফুলের মাঝে। প্রতি বারো বছর অন্তর যখন এই ফুল ফোটে, তখন পাহাড়ের সবুজ ঢাল এক নিমেষে গাঢ় নীল রঙে সেজে ওঠে। মনে হয় আকাশটা বুঝি মাটির টানে নিচে নেমে এসেছে। ২০১৮ সালে শেষবার এই রূপ দেখেছিল বিশ্ববাসী, যা পর্যটকদের কাছে এক স্বর্গীয় মুহূর্ত হয়ে আছে।
মধুচন্দ্রিমা বা একান্তে সময় কাটানোর জন্য মুন্নারের চেয়ে রোমান্টিক জায়গা খুব কমই আছে। বিশেষ করে নবদম্পতিদের জন্য এই শহরটি এক নীরব আশীর্বাদ। এখানকার ইরাভিকুলম ন্যাশনাল পার্কে যখন মেঘের চাদর আপনার পায়ের নিচে খেলা করবে, তখন প্রিয়জনের হাত ধরে সেই কুয়াশা ছোঁয়ার অনুভূতি হবে আজীবন মনে রাখার মতো। প্রায় ৯৭ বর্গকিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত এই উদ্যানে দেখা মেলে বিপন্ন ‘নীলগিরি থার’-এর। পার্কের ভেতরেই অবস্থিত দক্ষিণ ভারতের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ আনামুদি (২৬৯৫ মিটার)। বনদপ্তরের অনুমতি নিয়ে এই মেঘের রাজ্যে ট্রেকিং করা দুঃসাহসী দম্পতিদের জন্য এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা।
মুন্নারের রোমান্স পূর্ণতা পায় মাত্তুপেট্টি হ্রদের শান্ত স্থির জলে। ১৭০০ মিটার উচ্চতায় পাহাড় ঘেরা এই হ্রদে যখন আপনাদের নৌকাটি ধীরে ধীরে এগোবে, তখন চারপাশের ঘন বন আর পাহাড়ের ছায়া এক অপার্থিব পরিবেশ তৈরি করবে। কাছেই রয়েছে ইন্দো-সুইস লাইভস্টক প্রজেক্টের ডেইরি ফার্ম, যেখানে প্রকৃতির কোলে আধুনিক পশুপালনের এক অনন্য চিত্র দেখা যায়। একটু দূরেই পল্লিভাসল জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের চারপাশের প্রাকৃতিক শোভা পর্যটকদের পিকনিকের জন্য দারুণ এক পরিবেশ দেয়।
চিন্নাকনাল বা পাওয়ার হাউজ জলপ্রপাত থেকে যখন জলরাশি প্রায় ২০০০ মিটার উচ্চতা থেকে আছড়ে পড়ে, সেই দৃশ্যটি আপনার হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে দেবে। এখান থেকে কিছুটা দূরেই আনয়িরঙ্গলের জলাধার, যা ঘিরে আছে আদিগন্ত সবুজ চা বাগান আর চিরহরিৎ অরণ্য। আপনি যদি মেঘেদের ওপর দাঁড়িয়ে পৃথিবীকে দেখতে চান, তবে আপনাকে যেতে হবে ‘টপ স্টেশন’-এ। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৭০০ মিটার উঁচুতে দাঁড়িয়ে সূর্যোদয় দেখা এক রাজকীয় অভিজ্ঞতা, যেখান থেকে প্রতিবেশী রাজ্য তামিলনাড়ুর বিস্তৃত উপত্যকা চোখে পড়ে।
চা-প্রেমীদের জন্য টাটা টি-র চা মিউজিয়াম এক অনন্য গন্তব্য। নল্লাথান্নি এস্টেটে অবস্থিত এই মিউজিয়ামে চা শিল্পের ইতিহাস ও বিবর্তনের গল্প অতি সুন্দরভাবে সংরক্ষিত আছে। মুন্নার যাওয়ার জন্য নিকটতম রেলস্টেশন হলো আলুভা (১০৮ কিমি) ও আঙ্গামালি। কোচিন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সড়কপথে খুব সহজেই পৌঁছে যাওয়া যায় এই স্বপ্নের দেশে।
মুন্নার কেবল একটি ভ্রমণস্থল নয়, এটি প্রকৃতির সঙ্গে মিতালি করার এক নীরব আহ্বান। যেখানে পাহাড়, কুয়াশা আর সবুজ মিলে আপনাকে শেখাবে ধীরে বাঁচতে। জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করার জন্য এই নির্জনতা আর স্নিগ্ধতা এক চিরস্থায়ী স্মৃতি হয়ে থাকবে। মুন্নার থেকে ফেরা যায়, কিন্তু মুন্নার আপনার মন থেকে কখনও ফিরবে না।।
